
২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে বিশ্বব্যাপী আটটি রেডিও টেলিস্কোপ একই দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের লক্ষ্য ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষী: একটি বৃহদায়তন কৃষ্ণগহ্বর বা সুপারমেসিভ ব্ল্যাকহোল এর ঘটনা দিগন্তের (ইভেন্ট হরাইজন) ছায়ার ছবি নেয়া। ১০ এপ্রিল, ২০১৯-এ তারা মেসিয়ার ৮৭ (Messier 87) ছায়াপথের কেন্দ্রে কৃষ্ণগহ্বরের সর্বপ্রথম ছবিটি প্রকাশ করেছে, যেখানে মেসিয়ার ৮৭ হচ্ছে আমাদের ছায়াপথের কাছাকাছি ভারগো ছায়াপথগুচ্ছের একটি বৃহদায়তন ছায়াপথ।
অবশ্যই, ছবিটি সরাসরি কৃষ্ণগহ্বরের নয়, বরং তার ছায়া (কৃষ্ণগহ্বরের প্রকৃতিই বলে দিচ্ছে, কেন কৃষ্ণগহ্বরের ছবি নেয়া অসম্ভব)। কৃষ্ণগহ্বর এত শক্তিশালী মাধ্যাকর্ষণ ক্ষেত্র উৎপন্ন করে যে, কোন কিছুই, এমনকি দৃশ্যমান আলোও তাদের থেকে পালাতে পারেনা। পরিবর্তে, এই ছবিটি কৃষ্ণগহ্বরের ঘটনা দিগন্ত এবং তার ভেতরে কৃষ্ণগহ্বরের ছায়াকে দেখায়। এখানে ঘটনা দিগন্ত হচ্ছে কৃষ্ণগহ্বরের দ্বারা শোষিত হবার আগে তাকে ঘিরে থাকা ধুলো, গ্যাস, তারা ও আলোর ঘূর্ণি যা কৃষ্ণগহ্বরের প্রান্তে চক্রাকারে ঘোরে। ঘটনাদিগন্তের এই উপাদানগুলোর মধ্যে আলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেই আলোর ঘুর্ণি না থাকলে ছবিটাই ওঠানো যেত না।
ঘটনা দিগন্ত বা ইভেন্ট হরাইজন হল সেই অঞ্চল যেখানে আসলে আর পালানোর উপায় নেই। যখন কোনও বস্তু কৃষ্ণগহ্বরের ঘটনা দিগন্তের কাছে আসে, তখন এটি একটি ঘুর্ণায়মান চাকতি তৈরি করে। এই চাকতির ভেতরের বস্তুগুলো তার কিছু শক্তিকে ঘর্ষণে রূপান্তরিত করবে কারণ এটি সেখানকার অন্য বস্তুগুলোর সাথে ঘর্ষণ সৃষ্টি করে। এটি চাকতিকে উষ্ণ করে, ঠিক যেমন আমরা ঠান্ডা দিনে আমাদের দুই হাত একসাথে ঘষে গরম করি সেরকম। এই ঘর্ষণের ফলে ঘটনা দিগন্তের কাছাকাছি থাকা বস্তুগুলো অনেক বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং এর তাপমাত্রা শতশত সূর্যের তাপমাত্রার মত হয়ে যায়। এই ঐজ্জ্বল্যকেই ইএইচটি বা ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ ধরতে পেরেছে, সাথে ধরেছে কৃষ্ণগহ্বরের ছায়াটিকে।
ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ (ইএইচটি) কনসোর্টিয়াম ইন্টারফেরোমেট্রি নামে একটি বিষয় ব্যবহার করে এই অবিশ্বাস্য কৃতিত্ব অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। যদি আপনি একসঙ্গে দূরবর্তী দুটি টেলিস্কোপ ব্যবহার করেন, তবে আপনি পর্যবেক্ষণগুলি অবিশ্বাস্যভাবে একত্রিত করতে পারেন। টেলিস্কোপগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব যত বেশি হবে, ছবিও তত বেশি যথাযথ হবে। ইএইচটি এর দূরবীক্ষণ যন্ত্রগুলো সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে। চিলি, স্পেইন, হাওয়াই, মেক্সিকো এমনকি দক্ষিণ মেরুতেও এর দুর্বীক্ষণ যন্ত্র আছে। এরা সবাই একসাথে কাজ করলে একটি পৃথিবীর আকারের একক টেলিস্কোপের ক্ষমতা ধারণ করে। আর কেবলমাত্র এই পদ্ধতিতে এরকম ক্ষমতার টেলিস্কোপ দ্বারাই এভাবে M87 ছায়াপথ থেকে যথেষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়, যার ফলে তার কেন্দ্রের কৃষ্ণগহ্বরটি দেখা যায়।
ইএইচটি সায়েন্স কাউন্সিলের প্রধান এবং নেদারল্যান্ডসের রাডবউড বিশ্ববিদ্যালয়ের হিনো ফেলক একটি বিবৃতিতে বলেন “যদি জ্বলন্ত গ্যাসের একটি চাকতির মত উজ্জ্বল অঞ্চলে কৃষ্ণগহ্বরটি নিমজ্জিত থাকে তবে আমরা আশা করতে পারি যে কৃষ্ণগহ্বরটি ছবির এই ছায়ার মত অন্ধকার অঞ্চলটি তৈরি করবে – যা আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল কিন্তু আমরা তা আগে কখনও দেখিনি। এই ছায়াটি তৈরি হয়েছে মহাকর্ষীয় নমন বা বাঁক এবং ঘটনার দিগন্তের দ্বারা আলোর আটকে পড়ার ফলে। এর ফলে এই আকর্ষণীয় বস্তুটির প্রকৃতি সম্পর্কে অনেক কিছুই প্রকাশ পেল এবং আমরা M87 ছায়াপথের কৃষ্ণগহ্বরের বিশাল ভরকে পরিমাপ করতে পারলাম।”
M87 হল ৫৪ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত একটি উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সি, এবং এটির বৃহদায়তন কৃষ্ণগহ্বরটি আমাদের নিজস্ব ছায়াপথের কেন্দ্রস্থলের কৃষ্ণগহ্বরটির চেয়ে অনেক বড়। এর ভর সূর্যের ভরের তুলনায় ৬.৫ বিলিয়ন গুণ বেশি এবং এটি ৪০ বিলিয়ন কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। ইএইচটি এটির যে ছায়া ধারণ করেছে (ছবিটির ভেতরের কালো অংশটি) তা সেই কৃষ্ণগহ্বরের তুলনায় ২.৫ গুণ বড়।
ইএইচটি বোর্ড সদস্য ও ইস্ট এশিয়ান অবজারভেটরির পরিচালক পল টি.পি. হো বলেন, “যখন আমরা নিশ্চিত হলাম যে, আমরা ছায়াটির ছবি পেয়েছি, আমরা আমাদের পর্যবেক্ষণগুলিকে মোচড়ানো স্থান (warped space), অতিতপ্ত পদার্থ এবং শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের পদার্থবিজ্ঞান অন্তর্ভূক্ত এমন বিশাল কম্পিউটার মডেলগুলিতে এনে তুলনা করলাম। আমাদের পর্যবেক্ষণ করা চিত্রগুলির বেশিরভাগ বৈশিষ্ট্যই আমাদের তাত্ত্বিক উপলব্ধির সাথে বিস্ময়করভাবে মিলে যায় । এটি কৃষ্ণগহ্ববরের ভর নিয়ে আমাদের অনুমান সহ আমাদের করা পর্যবেক্ষণগুলির ব্যাখ্যার সত্যতা সম্পর্কে আমাদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।”
কৃষ্ণগহ্বরের এই পর্যবেক্ষণটি একটি অবিশ্বাস্য কৃতিত্ব, কিন্তু একই সাথে এটি আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা, কোয়ান্টাম মেকানিক্স, এবং নির্দিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞান তত্ত্বগুলির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এই ফলাফলগুলির খুটিনাটি Astrophysical Journal Letters জার্নালের একাধিক গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হয়েছে।
আমরা এখনও একটি কৃষ্ণগহ্বরের ভিতরে কী আছে তা জানি না, এবং এখনও পর্যন্ত তাদের চারপাশে কি ঘুরছে সে সম্পর্কে আমাদের কাছে খুব সামান্য নিশ্চয়তা আছে। এই বস্তুগুলো নিয়ে আমাদের পর্যবেক্ষণ প্রায় পুরোপুরি পরোক্ষ উপায়ে, সিমুলেশন এবং মডেল তৈরির মাধ্যমে হয়েছে। আমরা বস্তুর চেয়ে বরং তাদের প্রভাবই দেখতে পাই। এই অসাধারণ প্রকল্পটিকে ধন্যবাদ, যার ফলে আমরা অধরাকে ধরার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছি।
প্রশ্ন আসতে পারে, আমাদের নিজেদের ছায়াপথ মিল্কিওয়ে থাকতে অন্য ছায়াপথের কৃষ্ণগহ্বরের ছবি নিতে হল কেন? আলোর দ্রুত পরিবর্তনশীলতার কারণে এই সময়ে মিল্কিওয়ে এর কৃষ্ণগহ্বরটির ছবি নেয়া অত্যন্ত কঠিন ছিল। আশা করা যায়, শীঘ্রই এই কৃষ্ণবস্তুদের মত আকর্ষণীয় বস্তুর স্পষ্ট ছবি পাওয়ার জন্য ইএইচটি-তে আরও টেলিস্কোপ যুক্ত করা হবে। কোন সন্দেহ নেই যে, নিকট ভবিষ্যতেই আমরা আমাদের নিজস্ব ছায়াপথের অন্ধকার হৃদয়টিকে দেখতে সক্ষম হব।
তথ্যসূত্র:
1. https://iopscience.iop.org/article/10.3847/2041-8213/ab1141
2. https://www.iflscience.com/space/event-horizon-telescope-to-begin-most-detailed-observation-of-a-black-hole-in-april/
3. https://eventhorizontelescope.org/
4. https://www.eso.org/public/news/eso1907/
5. https://www.eso.org/public/news/eso1907/
Leave a Reply