
২০১৪ সালে সিনথেটিক বায়োলজি ফিল্ডের গবেষকগণ একটি অসাধারণ বিষয় আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। প্রথমবারের মত তারা প্রকৃতিতে না থাকা কৃত্রিম জেনেটিক মেটারিয়াল থেকে এনজাইম প্রস্তুত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর এই গবেষণাটি কেবল পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব সম্পর্কিত ধারণাই প্রদান করে নি, সেই সাথে বাইরের গ্রহে এলিয়েনদের খোঁজা সম্পর্কেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সামনে তুলে এনেছিল।
গবেষণাটির মূল ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল আরও দুই বছর আগে যখন যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীগণ ডিএনএ এর একটি কৃত্রিম সংস্করণ তৈরি করে দেখান। এই ডিএনএ অণুটি হল সেই অণু যা পৃথবীর সকল জীবিত কিছুর জেনেটিক তথ্য বহন করে, আর এর সবচেয়ে নিকটসম্পর্কীয় ভাইটি হচ্ছে আরএনএ। এই সিন্থেটিক জেনেটিক মেটারিয়ালটি তৈরি করা হয়েছিল সেইসব বিল্ডিং ব্লক বা উপাদানগুলো দিয়ে যেগুলো ডিএনএ ও আরএনএ-তেই পাওয়া যায়। কিন্তু গবেষকগণ এই উপাদানগুলোকে জুড়ে দিয়েছিলেন ভিন্ন অণু দিয়ে। আর এর ফলেই প্রস্তুত হয়েছিল কৃত্রিম জেনেটিক মেটারিয়াল। বিজ্ঞানীগণ এর নাম দিয়েছিলেন এক্সএনএ (XNA – জেনো নিউক্লিইক এসিড)। এটাও ডিএনএ এর মতই জেনেটিক ইনফরমেশন সংরক্ষণ করতে সক্ষম।
যদিও এটা বিজ্ঞানমহলে খুবই মনে করা হয় যে, কেবল ডিএনএ, আরএনএ এবং প্রোটিনই এনজাইম প্রস্তুত করতে পারে, গবেষকগণ দেখিয়ে দিলেন এই এক্সএনএ-গুলো দিয়েও এনজাইম তৈরি করা সম্ভব। এই তৈরি এনজাইমগুলোর নাম দেয়া হয়েছে “এক্সএনএজাইমস” (XNAzymes)। এই এনজাইম প্রাকৃতিক এনজাইমগুলোর মতই আরএনএ এর বিটগুলোকে কাটতে ও জোড়া লাগাতে সক্ষম।
এনজাইম হচ্ছে প্রকৃতির ক্যাটালিস্ট বা অনুঘটক। এটা জীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ কেননা কোষে সংঘটিত প্রায় সকল জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলোই কক্ষতাপমাত্রায় হয় না। আর তাই বিক্রিয়াগুলো চলার জন্য এনজাইমের প্রয়োজন হয়, যেমন ডিএনএ প্রস্তুত করতে, খাদ্য হজম করাতে ইত্যাদি। আর এইসব শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া প্রক্রিয়া যাতে জীবনের অস্তিত্বের জন্য যথেষ্ট হারে সংঘটিত হয় তা নিশ্চিত করে এই এনজাইমগুলো।
যদিও বেশিরভাগ এনজাইমই প্রোটিন হয়ে থাকে, কিছু কিছু আরএনএ অণুরও এনজাইমের মত ক্যাটালাইটিক এক্টিভিটি বা অনুঘটক ক্রিয়া রয়েছে। ধারণা করা হয় যে, জেনেটিক মেটারিয়ালগুলোর আদি রূপ ছিল আরএনএ। আর বিজ্ঞানমহলে এও খুব ধারণা করা হয় যে, জেনেটিক ইনফরমেশন এর আদি রূপ বিবর্তিত হয়ে সেলফ রেপ্লিকেটিং এনজাইম বা নিজেই নিজের প্রতিরূপ তৈরি করতে সক্ষম এনজাইমে পরিণত হয়েছিল, যা পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভবের জন্য ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই গবেষণাটি তাই অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এটি জীবনের আদীমতম ধাপগুলোর একটি পুনরায় তৈরি করে। সেই সাথে আরও যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি এই গবেষণা আমাদের দেখাচ্ছে, তা হল প্রাণ ডিএনএ ও আরএনএ ছাড়াই বিবর্তিত হতে পারে, যেগুলোকে জীবনের জন্য এতদিন প্রাথমিক শর্ত বলে মনে করে আসা হচ্ছিল।
প্রধান গবেষক ফিলিপ হলিজার বলেন, “আমাদের এই গবেষণাটি বলছে, নীতি অনুযায়ী জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যাটালাইটিক প্রোসেস বা অনুঘটক ক্রিয়া চালাবার জন্য প্রকৃতিতে বিভিন্ন ধরণের অণু থাকতে পাএ। জীবনের ক্ষেত্রে আরএনএ ও ডিএনএ এর নির্বাচনটা হয়তো কেবলই প্রিহিস্টোরিক কেমিস্ট্রির একটি একসিডেন্ট ছিল”।
যেহেতু দেখা যাচ্ছে, প্রকৃতিতে তৈরি হয় না এরকম বিল্ডিং ব্লক থেকেও জেনেটিক মেটারিয়াল এবং এনজাইম তৈরি হওয়া সম্ভব, তাই এটা আমাদের বলছে পৃথিবীর বিভিন্ন আণবিক কাঠামো বা মলিক্যুলার ব্যাকবোন থেকে প্রাণের উৎপত্তি সম্ভব হতে পারে। আর হলিজারের মতে এটাই কোন ধরণের জীবনের জন্য উপযোগী বলে বিবেচিত এক্সোপ্লানেটের সংখ্যা অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে।
গবেষকদের মতে এই গবেষণাটি বিভিন্ন ধরণের রোগের চিকিৎসাপদ্ধতির সন্ধানও দিতে পারে। ডঃ হলিগার বলেন, ক্যান্সার জিন বা ভাইরাল আরএনএ এর অংশ থেকে প্রস্তু হওয়া আরএনএকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলে এই রোগগুলোর চিকিৎসার জন্য এক্সএনএ ব্যবহার করা যেতে পারে। আর যেহেতু এক্সএনএ প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয় না, সুতরাং এটি শরীরের এনজাইম দ্বারা সনাক্তকৃত বা ধ্বংসও হবে না।
তথ্যসূত্র:
1. http://www.cam.ac.uk/research/news/worlds-first-artificial-enzymes-created-using-synthetic-biology
3. http://www.nature.com/nature/journal/vaop/ncurrent/full/nature13982.html
4. http://www.bbc.co.uk/news/health-30274635
Leave a Reply