
যদিও আমরা হয়তো কখনই সঠিকভাবে জানতে পারব না যে কিভাবে পৃথিবীতে জীবনের উত্থান ঘটেছিল, ২০১৫ সালে বিজ্ঞানীগণ একটি ভিন্ন উপায় গ্রহণ করেছিলেন, যার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জিং প্রশ্নটির উত্তর দেয়ার চেষ্টা করা হয়। কেউ কেউ মনে করেন, একটি এস্টারয়েড বা গ্রহাণু অথবা ধূমকেতু এসে জীবন তৈরির রাসায়নিক বিল্ডিং ব্লকগুলো তৈরির জন্য সঠিক অবস্থা তৈরি করে দিয়েছিল। আর এখন, গবেষকগণের কাছে এই ধারণাটির সমর্থনের জন্য কিছু অসাধারণ সাক্ষ্যপ্রমাণও রয়েছে।
চেক রিপাবলিকের একাডেমি অব সায়েন্সেস এর গবেষকগণ একটি উচ্চ ক্ষমতার লেজার ব্যবহার করে পৃথিবীতে ধূমকেতু বা উল্কার একটি সংঘর্ষ সিমুলেশন বা প্রতিরূপ তৈরি করেন। এর মাধ্যমে একটি কেমিকেল স্যুপ থেকে ডিএনএ এর নিকট সম্পর্কযুক্ত আরএনএ এর চারটি প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরি করা হয়। কীভাবে পৃথিবীতে প্রথম জীবন শুরু হয় তা এই কাজটি ব্যাখ্যা করতে পারে না, এটাই প্রথমবার যেখানে একই এক্সপেরিমেন্টাল কন্ডিশনে আরএনএ এর চারটি অণুই তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। গবেষণাটি প্রোসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল।
কিভাবে জড়বস্তু থেকে জীবের উদ্ভব হল তা বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের কাছে একটি ধাঁধা হয়ে ছিল। যখন বিজ্ঞানীগণ প্রাথমিক পৃথিবীর পরিবেশ কেমন ছিল সে বিষয়ে বিজ্ঞানীগণ বুঝতে শুরু করল, তখন থেকেই তারা সেই অবস্থাটি পুনরুৎপাদনের জন্য বিভিন্ন ভাবে চেষ্টা করে গেছেন। আশা একটাই, যদি এমন কোন অণু পাওয়া যায় যা জীবনের উদ্ভবের সাথে জড়িত।
আমাদের গ্রহে জীবনের উদ্ভব হয়েছিল প্রায় চার বিলিয়ন বছর পূর্বে। সেটা এমন একটি সময় যখন ১৫০ মিলিয়ন বছর জুড়ে পৃথিবীতে “লেট হেভি বোম্বার্ডমেন্ট” চলছিল যখন। এই সময়ে প্রচুর পরিমাণে এস্টারয়েড বা গ্রহাণু পৃথিবীতে আঘাত করে এবং ফলতঃ সমস্ত পৃথিবী ধ্বংসাবশেষে ভরে যায়। কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, এই সংঘর্ষগুলোর ফলে তদকালীন জীবনের ধরণগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল, আবার অনেকেই মনে করেন যে সেই সংঘর্ষগুলোই প্রাণ সৃষ্টির প্রয়োজনীয় বিল্ডিং ব্লক তৈরির উপযুক্ত পরিবেশ প্রদান করে।
মহাশূন্য থেকে আসা গ্রহাণুগুলোর সংঘর্ষকে সিমুলেট করা বা প্রতিরূপ তৈরি করার জন্য, গবেষকগণ প্রথমে কাঁদা এবং ফরমামাইড এর কেমিকেল স্যুপে উচ্চ ক্ষমতার লেজার প্রয়োগ করেন। ফরমামাইড হচ্ছে একটি সরল রাসায়নিক দ্রব্য যা হাইড্রোজেন সায়ানাইডের সাথে জলের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় উৎপাদিত হয়। ২০০১ সালে দুজন ইতালিয় গবেষক দেখিয়েছিলেন এই ফরমামাইড হল জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় অণুসমূহের প্যারেন্ট কম্পাউন্ড বা অভিভাবক যৌগ (যেখান থেকে এরা তৈরি হয়)। এই রাসায়নিক দ্রব্যটি প্রাথমিক পৃথিবীতে প্রচুর পরিমাণে উপস্থিত ছিল। এমনকি ধূমকেতুর লেজেও এই রাসায়নিকটিকে দেখা যায়। আবার, এর পূর্বের গবেষণাগুলো থেকে দেখা যায়, এর সাথে অন্য কিছু জিনিস ব্যবহার করে প্রাণ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিল্ডিং ব্লকগুলো প্রস্তুত করা সম্ভব।
ব্যবহার করা লেজার পালস প্রচণ্ড চাপ ও তাপ উৎপন্ন করে। এর ফলে তাপমাত্রা ৪২০০oC এ পৌঁছে যায়, সেই সাথে এক্সরে এবং অতিবেগুণী রশ্মিও তৈরি হয়। এতে ঠিক সেই অবস্থাটাই তৈরি হয় যা মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ পৃথিবীতে ধাক্কা খেলে তৈরি হয়ে থাকে। যখন গবেষকগণ উৎপাদিত হওয়া অণুগুলো পরীক্ষা করে দেখলেন, তারা আরএনএ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় চারটা বিল্ডিং ব্লকই খুঁজে পেলেন। এরা হল এডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন এবং ইউরাসিল। এদের প্রথম তিনটি আবার ডিএনএ-তেও পাওয়া যায়। যদিও পৃথিবীর জীবনের অণু হচ্ছে ডিএনএ, তবুও অনেকে মনে করেন, আরএনএ-ই ছিল প্রথম অণু যা প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় জেনেটিক ইনফর্মেশন বা তথ্যগুলো ধারণ করেছিল।
যাই হোক, এই গবেষণাটিও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। অনেকেই মতামত দিয়েছেন, প্রাকজীবন পৃথিবীতে বিশুদ্ধ ফরমামাইড এর অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু আবার অনেকে এও বলেছেন, সেসময় জল এতটাই বেশি ছিল যে সেসময় ফরমামাইডে পূর্ণ পুলের অস্তিত্ব নাও থাকতে পারে। এছাড়াও এই গবেষণাটি আমাদেরকে বলতে পারে না, কিভাবে এই বিল্ডিং ব্লকগুলো থেকে আরএনএ তৈরি হয়। গবেষকগণ এই সমালোচনাগুলো স্বীকার করে নেন এবং তারা এটা নিয়ে আরও গবেষণা করার পরিকল্পনা করেন।
তথ্যসূত্র:
- http://www.pnas.org/content/early/2014/12/05/1412072111
- http://news.sciencemag.org/biology/2014/12/asteroid-impacts-may-have-formed-life-s-building-blocks
- http://www.newscientist.com/article/dn26672-formation-of-lifes-building-blocks-recreated-in-lab.html#.VIa_CjGsW4g
- http://www.nature.com/nature/journal/v435/n7041/full/nature03676.html
- http://www.latimes.com/science/sciencenow/la-sci-sn-asteroid-impact-life-earth-20141208-story.html
- http://www.rsc.org/chemistryworld/2014/12/asteroid-bombardment-may-have-made-building-blocks-life-early-earth-dna-formamide
- http://www.latimes.com/science/sciencenow/la-sci-sn-asteroid-impact-life-earth-20141208-story.html
Leave a Reply