Table of Contents
ভূমিকা
সম্প্রতি মাস্কের স্টারলিংক নিয়ে খুব আলোচনা চলছে। আমি বরং মাস্ককে নিয়েই কিছু কথা বলি। বৈদ্যুতিক গাড়ি বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। আর এক্ষেত্রে আমরা দেখছি বর্তমানে চীনের চ্যালেঞ্জ ও ইউরোপের জবাবদিহিতার আড়ালে আরেকটি কোম্পানির নাম ক্রমশ কম উচ্চারিত হচ্ছে। এই লেখাটি হলো সেই টেসলা (Tesla) সম্পর্কে। টেসলা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্র্যান্ড। এটা সত্য যে চীনা কোম্পানি বিওয়াইডি (BYD, Build Your Dreams)-র বিক্রি দিন দিন বেড়ে চলেছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো মানুষের মুখে এখনও “টেসলা” নামটিই বেশি উচ্চারিত হয়। অনেকটা যেমন মানুষ সব ধরনের মোটরবাইকের বেলায় হোন্ডা শব্দটি ব্যবহার করে থাকে, ঠিক সেভাবেই বৈদ্যুতিক গাড়ির বেলায় বিশ্বে সবার মুখে টেসলার নামই উঠে আসে। তবে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের চ্যালেঞ্জ তো রয়েছেই, পাশাপাশি টেসলার জন্য আরেকটি বড় মাথাব্যথার কারণ হতে পারে স্বয়ং ইলন মাস্ক।
বাজারের প্রেক্ষাপট
জার্মানিতে টেসলার বিক্রি ৫৯% কমে গেছে, এবং এটি গত কয়েক বছরের মধ্যে টেসলার সবচেয়ে খারাপ অবস্থা। শুধু জার্মানি নয়, ফ্রান্সে টেসলার বিক্রি কমেছে ৬৩% আর স্পেনে ৭০%-এর বেশি। এর সঙ্গে যুক্ত করুন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের চিত্র, যেখানে টেসলার Model 3 গাড়ির বিক্রি ২০২৪ সালের মধ্যে ৩৬% হ্রাস পেয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে টেসলার শেয়ারের মূল্য থেকে কয়েক শো বিলিয়ন ডলার উবে গেছে।
অনেক বিশ্লেষকের দাবি, এর জন্য দায়ী মূলত ইলন মাস্কের রাজনৈতিক অবস্থান। তাদের মতে, মাস্ক এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের “ছায়া-প্রেসিডেন্ট” হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। আর অন্যদিকে টেসলার যে গ্রাহকগোষ্ঠী সাধারণত অপেক্ষাকৃত উদারপন্থী বা পরিবেশ-সচেতন বলেই ধরা হয়। ফলে এই গ্রাহকগোষ্ঠীর বড় একটা অংশ এখন বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি দপ্তরের (US Department of Energy) তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বৈদ্যুতিক গাড়ির সবচেয়ে বড় বাজার হলো ক্যালিফোর্নিয়া—যাকে আবার অনেক রক্ষণশীল ব্যক্তি “ওয়োক (woke) প্যারাডাইস” বলেও বিদ্রূপ করে থাকেন। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ১০টি রাজ্যের গাড়ি নিবন্ধন তথ্য পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, ক্যালিফোর্নিয়ায় যতগুলো বৈদ্যুতিক গাড়ি নিবন্ধিত হয়, বাকি ৯টি রাজ্যের মোট যোগফলের কাছাকাছি বা তার চেয়েও বেশি। আর এই ক্যালিফোর্নিয়াতেই টেসলার বিক্রি কমতে শুরু করেছে।
এদিকে মাস্ক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমাকে (Kier Starmer) প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন, আবার জার্মানির কট্টর ডানপন্থী দল আল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (Alternative for Germany) কে সমর্থন দিচ্ছেন। এসব ঘটনার জেরে অনেকেই টেসলাকে বয়কটের ডাক দিয়েছেন। যদিও শুধুমাত্র বয়কট দিয়েই বিক্রি এতটা নামার কারণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, তবে মাস্কের লাগাতার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড যে কিছুসংখ্যক সম্ভাব্য গ্রাহককে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, সেটাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিক্রয়ে ধস: পরিসংখ্যানের বিশ্লেষণ
একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা জরুরি—টেসলার বিক্রি কমছে বলে যে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারও কমে যাচ্ছে, ব্যাপারটা কিন্তু তা নয়। বরং বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি বেড়ে চললেও, বৃদ্ধির গতিবেগ ২০২১ সাল থেকে কমে আসছে। ২০২৪ সালের শেষে, বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রির বৃদ্ধির হার মাত্র দুই বছর আগের তুলনায় ৬০% কমেছে। অর্থাৎ বিক্রির সংখ্যা এখনও বাড়ছে, কিন্তু সে বৃদ্ধির হার শ্লথ হয়ে আসছে।
কেন এমন হচ্ছে? কারণ যারা একবার বৈদ্যুতিক গাড়ি কিনেছে, তারা অতি দ্রুত গাড়ি বদলায় না। উপরন্তু ২০২৪ সালের আগে টেসলার বিক্রি প্রায় উল্লম্ফনের মতোই বেড়েছে। অস্বাভাবিক গতিতে বিক্রি বাড়ার পর একসময় তা কমবেই। চার-পাঁচ বছর আগেও টেসলার একতরফা আধিপত্য ছিল, কিন্তু এখন অন্যান্য নির্মাতারা সরকারি ভর্তুকির সাহায্যে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। ফলাফল? এখন যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হওয়া সব বৈদ্যুতিক গাড়ির মধ্যে টেসলার অংশও অর্ধেকের নিচে। অথচ আমেরিকান বাজারে চীনা ব্র্যান্ডের উপস্থিতি এখনো নগণ্য। অর্থাৎ, টেসলার বিক্রি যদি কিছুটা কমে থাকে, তা একদিক থেকে স্বাভাবিক ঘটনা।
তবে সমস্যা হলো, ২০২৪ সালে টেসলার এই স্বাভাবিক ধীরগতির পাশাপাশি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতেই আরও বড় ধস নেমেছে। জার্মানিতে ২০২৫-এর জানুয়ারিতে টেসলার বিক্রি প্রায় ৬০% কমে যায়; অথচ সেই একই সময়ে জার্মানিতে বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন ২০২৪ সালের জানুয়ারির তুলনায় ৫০% বেড়েছে। ফোক্সওয়াগেনের মতো প্রস্তুতকারক সেখানে আগের চেয়ে ৬,০০০টি বেশি বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি করেছে।
ফলে বোঝাই যাচ্ছে, ইউরোপের দেশগুলোতে মানুষ বৈদ্যুতিক গাড়ি কিনছেই, কিন্তু টেসলা না কিনে অন্য ব্র্যান্ড কিনছে। এদিকে ইলন মাস্ক বরাবরই অদ্ভুত স্বভাবের—প্রচণ্ড মেধাবী হলেও বিতর্ক পছন্দ করেন। বহু বছর ধরে তিনি আকর্ষণীয় চরিত্র হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। কিন্তু টুইটার (পূর্বনাম Twitter, বর্তমানে X) অধিগ্রহণ, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রকাশ্য সমর্থন, ডোজ (DOGE – Department of Government Efficiency) ঘিরে প্রবল উত্তেজনা ইত্যাদি ঘটনার পর তার জনপ্রিয়তায় বড়সড় ধস নেমেছে।
মাস্কের রাজনৈতিক অবস্থান
সম্প্রতি এক জরিপে দেখা গেছে, জার্মানদের ৭০% ইলন মাস্কের প্রতি নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। এমনকি মাস্ক যে দলটিকে সমর্থন দিচ্ছেন—সেই কট্টর ডানপন্থী আল্টারনেটিভ ফর জার্মানির (Alternative for Germany) ভোটারদের এক-তৃতীয়াংশও তাকে অপছন্দ করে। তার চেয়েও বড় কথা, এই দলের অর্ধেক ভোটারই মাস্কের “বিদেশী হয়ে জার্মান রাজনীতিতে নাক গলানো” পছন্দ করে না।
এর পেছনে এক ধরনের মনস্তত্ত্ব কাজ করে। যেমন—ফুটবলে আপনার পছন্দের দলের গোলকিপার ভুল করলে আপনিই প্রথমে গালি দেবেন, কিন্তু অন্য দলের কেউ যদি আপনার গোলকিপারকে আক্রমণ করে, তাহলে আপনি অসহিষ্ণু হয়ে উঠবেন। জার্মান নাগরিকেরা তাদের রাজনীতিতে এক বহিরাগত ব্যক্তির হস্তক্ষেপ ভালোভাবে নেয় না। এমনকি মাস্কের মতাদর্শ তাদের অনুকূল হলেও।
অর্থাৎ প্রশ্ন উঠছে, ইলন মাস্ক কি টেসলার জন্য সত্যিই বিষাক্ত সম্পদে পরিণত হলেন? আবার পুরোপুরি সেটাও বলা যায় না। কারণ যুক্তরাজ্যে মাস্কের ভাবমূর্তি জার্মানির চেয়েও খারাপ বলে জরিপে দেখা গেছে, বিশেষত কিয়ার স্টারমার সংক্রান্ত মন্তব্যের পর। তবু সেখানকার বাজারে টেসলার বিক্রি ১২% কমেছে, যা জার্মানির ৬০%-এর পতনের তুলনায় অনেক কম।
শেয়ারের ক্ষেত্রেও এমন চিত্র দেখা যায়। শেয়ারমূল্য পড়েছে বটে, কিন্তু এখনো এটি ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালে নির্বাচিত হওয়ার আগের স্তরের চেয়ে বহুগুণ ওপরে। উপরন্তু টেসলার শেয়ারের দাম বর্তমানে তাদের বাৎসরিক আয়ের ১২০ গুণের মতো, যেখানে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ (S&P 500)-এর গড় P/E অনুপাত ২২-এর আশেপাশে। অর্থাৎ বাজার এখনো টেসলা নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী।
বিদ্যুৎচালিত গাড়ির (EV) ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা
সুতরাং জানুয়ারি ২০২৫-এর বাজে ফলাফল ব্যাখ্যা করতে অন্য কারণও থাকতে পারে। যেমন, ডিসেম্বর ২০২৪-এর বিক্রি ছিল বরং বেশ ভালো। কেউ কেউ বলছেন, ২০২৪ সালের হিসাব চূড়ান্ত করার আগে টেসলা যতটা সম্ভব গাড়ি বিক্রি করে ফেলতে চেষ্টা করেছিল। তাই জানুয়ারিতে সাময়িক বিরতি দেখা গেছে। অন্য কারণ হতে পারে উৎপাদনে সাময়িক ছন্দপতন। মাস্ক তার কিছু কারখানায় মডেল ওয়াই (Model Y) গাড়ির নতুন সংস্করণ তৈরির জন্য যন্ত্রাংশ ও উৎপাদনপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনছেন। মডেল ওয়াই টেসলার অন্যতম সেরা বিক্রিত গাড়ি। এর ‘রিডিজাইন’ ইতোমধ্যে কিছু দেশে অগ্রিম অর্ডারের জন্য উপলব্ধ, মার্চ মাসে সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার দ্রুত বিকাশমান হওয়ায় প্রতিটি নতুন মডেলে আগের চেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা যোগ হয়। ফলে নতুন মডেল আসার আগে অনেকেই অপেক্ষা করে কেনাকাটা করে, যাতে নতুন ফিচার পেতে পারে বা পুরনো মডেল সস্তায় পেতে পারে। এই মনোভাব সাময়িকভাবে বিক্রি হ্রাস করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে গেম কনসোলের কথা ভাবুন। আপনি নতুন প্লে-স্টেশন বা এক্সবক্স কিনতে চাচ্ছেন, কিন্তু জানেন যে এক বছরের মধ্যেই আরো উন্নত একটি সংস্করণ আসছে। তখন হয়তো আপনি অপেক্ষা করবেন। যারা পুরনো কনসোল কিনে ফেলেছে, তারা নতুনটি আসলে দ্বিতীয় বাজারে পুরনোটা বিক্রি করে দেবে, ফলে দাম আরও কমবে। ঠিক তেমনটাই বৈদ্যুতিক গাড়ির বেলায়ও ঘটতে পারে। ফোক্সওয়াগেনের কথাই ধরুন, জার্মানিতে যারা সবচেয়ে বেশি বিক্রি করেছে। তাদের খুব অদূর ভবিষ্যতে বড় কোনো নতুন মডেল আসছে না—বিশেষ করে “২০,০০০ ইউরোর” বৈদ্যুতিক ফোক্সওয়াগেন ২০২৭ সালের আগে আসার সম্ভাবনা নেই। ফলে যারা ফোক্সওয়াগেন কেনার কথা ভাবছে, তারা এখনই কিনে ফেলতে অনুপ্রাণিত হচ্ছে। কিন্তু টেসলার বেলায় সম্ভাব্য ক্রেতারা ভাবছে, “নতুন মডেল তো আসছে, একটু অপেক্ষা করি।”
সুতরাং এখানে একাধিক বিষয় কাজ করেছে—(১) ডিসেম্বরের চড়া বিক্রি শেষ করে বছরের হিসাব মেলানো, (২) নতুন ডিজাইনের প্রস্তুতি নিতে উৎপাদনে সাময়িক বিরতি, এবং (৩) ক্রেতাদের “নতুন মডেল আসছে, অপেক্ষা করি” মনোভাব। অবশ্যই, টেসলার শেয়ারহোল্ডারদের বড় একটা অংশ হয়তো চায়, ইলন মাস্ক রাজনীতি নিয়ে কম কথা বলুন এবং নিজের টুইটার বা এক্স অ্যাকাউন্ট অন্য কারও হাতে ছেড়ে দিন। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের মনে একটি আশা থেকেই যাচ্ছে যে, আগামী মডেল ওয়াইয়ের সংস্করণ উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিগত উন্নতি আনবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং, ব্যাটারি প্রযুক্তি ও টেসলা এনার্জি
এই সম্ভাব্য উন্নতির কেন্দ্রে রয়েছে টেসলার এআই (AI) কার্যক্রম। কারণ বৈদ্যুতিক গাড়ির সঙ্গে আরেকটি ধারণা জড়িত—স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং (autonomous driving)। স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং-এর মূলত দুটি পদ্ধতি আছে—
১. খুবই ব্যয়বহুল এক ধরনের রাডার বা লাইডার (LiDAR) ব্যবহার করা, যা গাড়ির চারপাশের থ্রিডি মানচিত্র তৈরি করে।
২. সাধারণ ক্যামেরা ও সেন্সর ব্যবহার করা, যা অনেক সস্তা, তবে এজন্য অনেক বেশি উন্নত এআই দরকার।
টেসলা বরাবরই দ্বিতীয় পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, এই আশায় যে এআই যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠলে সস্তার সেন্সর দিয়েও স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং সম্ভব হবে। এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, এআই-এর দ্রুত উন্নয়নের কারণে টেসলার এই বাজি অনেকাংশে সার্থক হতে শুরু করেছে। টেসলার আরেকটি “গোপন অস্ত্র” হলো শ্যাডো ড্রাইভিং। এর মানে কী? প্রতিবার কেউ তার টেসলা চালু করলে, এমনকি যদি সে নিজেই চালায়, তবে গাড়ির কম্পিউটার স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং মোডে থাকলে কী করত, সেটি নীরবে মিলিয়ে দেখে। এতে প্রচুর পরিমাণ তথ্য (data) তৈরি হয়, যা টেসলার এআইকে আরো উন্নত করতে ব্যবহৃত হয়। এ কারণেই টেসলা গত ৪ মাসে এআই-তে বিনিয়োগ ২১% বাড়িয়েছে। ৫০,০০০টি এনভিডিয়া এইচ১০০ চিপের (H100 chips) বিশাল এক ক্লাস্টার তৈরি করছে তারা। পাশাপাশি ইলন মাস্কের অন্যান্য কোম্পানির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সংক্রান্ত গবেষণার অগ্রগতিও টেসলা ব্যবহার করতে পারবে।
তবে গল্প এখানেই শেষ নয়। টেসলার এআই বিভাগই কেবল পুরোদমে কাজ করছে তা নয়। টেসলা এনার্জি নামের আরেকটি বিভাগ আছে যা গাড়ির ব্যাটারি ছাড়াও বিভিন্ন জ্বালানি সমাধান নিয়ে কাজ করে। এটিও বিক্রি দ্বিগুণ করেছে গত ৪ মাসে। ব্যাটারি হলো বৈদ্যুতিক গাড়ির মেরুদণ্ড, এবং এই সেক্টরে রাজস্বের ১০০% বৃদ্ধির খবর টেসলার ভবিষ্যৎ বিক্রির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির মূল চালিকা শক্তিই হলো ব্যাটারি। এখানে যার প্রযুক্তি যত উন্নত, সেই কোম্পানি তত এগিয়ে থাকবে। টেসলা এনার্জির ফলাফল দেখাচ্ছে, তারা শুধু গাড়ির ক্ষেত্রেই নয়, বিকল্প জ্বালানি সংরক্ষণ (energy storage) ক্ষেত্রেও বড় উন্নতি করছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, টেসলা এনার্জির আয় (revenue) আগের তুলনায় ১০০% বেড়েছে। এর মানে, শুধু গাড়ি বিক্রির ওপর নির্ভর না করে, টেসলা অন্য খাত থেকেও বড় অঙ্কের মুনাফা তৈরির সুযোগ পেতে যাচ্ছে। ফলে কোম্পানির সামগ্রিক স্থিতিশীলতা বাড়তে পারে।
মার্কিন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক
অনেকেই ভাবছেন, ইলন মাস্ক ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন করে যদি মার্কিন প্রশাসনের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন, তবে সেটা কি টেসলার বিক্রি বাড়াতে সাহায্য করবে না? কিন্তু ঘটনা এত সহজ নয়। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, ট্রাম্প ৭,৫০০ ডলারের কর-ছাড় (tax credit) বাতিল করেছেন যা বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্রেতারা পেতেন। প্রথমদিকে কেউ কেউ ভেবেছিল, মাস্ক যেহেতু বাজারে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে আছেন, তাই প্রতিযোগীদের ভর্তুকি না দিয়ে সরকার বুঝি মাস্ককে বাড়তি সুবিধা দিতে চাইছে। কিন্তু মাস্ক শুরুতে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরব হন, পরে আবার বিষয়টিকে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করেন। মনে হচ্ছিল, তিনি এতে খুশি নন।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার কারণে অন্য কোথাও দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। মার্কিন সরকারের বিভিন্ন কাজ তদারকি (auditing) করার দায়িত্ব এখন মাস্কের ওপর বর্তাতে চলেছে, যার মধ্যে আছে তার নিজের কোম্পানিগুলোর সাথে সরকারের চুক্তি, আবার প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিদের সাথেও সরকারি লেনদেন। স্পষ্টতই, এখানে স্বার্থসংঘাত (conflict of interest) তৈরি হওয়ার ঝুঁকি আছে। এই সমস্যা এড়াতে কিছু সরকারি চুক্তি ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর (State Department) ৪০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের সাঁজোয়া গাড়ি (armored vehicles) কেনার পরিকল্পনা বাতিল করেছে, যা টেসলার সাথে চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিল। ২০২৫ সালের সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় সরকারি চুক্তি হতে পারত এটি। কিন্তু এখন সেই দরকারি অর্থ বরাদ্দ স্থগিত রাখা হয়েছে। ট্রাম্পের নির্বাচনী জয়ে শেয়ারবাজারে টেসলার দাম বেড়ে গেলেও এই “নতুন বন্ধুত্ব” শেষ পর্যন্ত কেমন ফল দেবে, সেটিই দেখার বিষয়।
উপসংহার
এই সব কিছু মিলিয়ে কী দাঁড়াচ্ছে? ইলন মাস্ক রাজনীতি নিয়ে যত বেশি কথা বলছেন, টেসলার গ্রাহকরা কি ততটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন? হতে পারে। তবে অন্য অনেক কারণও রয়েছে।
১. টেসলার নতুন মডেল (Model Y)-এর বড়সড় পরিবর্তন আসার অপেক্ষায় হয়তো অনেক ক্রেতা কেনাকাটা স্থগিত রেখেছে।
২. ডিসেম্বরের উল্লম্ফনোন্মুখ বিক্রির পর জানুয়ারিতে স্বাভাবিক কারণেই কিছুটা পতন ছিল।
৩. বিশ্বের অন্যান্য বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা—ফোক্সওয়াগেন থেকে শুরু করে চীনা ব্র্যান্ড—এখন অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক, ফলে টেসলার একচ্ছত্র আধিপত্য আর নেই।
৪. এআই ও ব্যাটারি খাতে টেসলা প্রচুর বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাব বাজারে পড়তে সময় লাগবে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালের শুরুটা টেসলার জন্য খুব একটা সুখকর না হলেও, তাদের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি উন্নয়নের জোরে প্রতিষ্ঠানটি এখনো উচ্চমূল্যায়িত (optimistic valuation) অবস্থায় আছে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—ইলন মাস্ক যদি তার উচ্চকণ্ঠ রাজনৈতিক মতামত অব্যাহত রাখেন, তা কি ভবিষ্যতে টেসলার বিক্রি ও ভাবমূর্তি আরো ক্ষতিগ্রস্ত করবে? নাকি নতুন মডেল, নতুন এআই ও ব্যাটারি প্রযুক্তির সাফল্য সেসব বিতর্ক ছাপিয়ে যাবে? অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বছরটির দ্বিতীয় ভাগে (২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে শেষ) টেসলা মুনাফা ৩০% পর্যন্ত বাড়তে পারে। তাই সংস্থাটি আপাতত কিছুটা বিক্রি কমে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে রাজি আছে, যদি পরবর্তীকালে নতুন মডেলের সাফল্যের মাধ্যমে বাজার কাঁপিয়ে দেওয়া যায়। অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সাথে টেসলার সম্পর্কও নানা আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। কর-ছাড় বাতিল করার মতো পদক্ষেপে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের আনুকূল্য পাওয়া সবসময় যে টেসলার জন্য ইতিবাচক, তা নয়। উল্টো অতিরিক্ত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা মাস্কের কোম্পানির জন্য জটিলতা তৈরি করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, টেসলার সাম্প্রতিক পতন ও ইলন মাস্কের রাজনৈতিক উচ্চকণ্ঠ আপাতদৃষ্টে জোড়া সঙ্কটের ইঙ্গিত দেয়। তারপরও আসন্ন মডেল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্যাটারি প্রযুক্তি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে বিনিয়োগের কারণে কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা অটুট থাকতে পারে। এর ফলাফল কী দাঁড়ায়, তা আসন্ন মাসগুলোতেই স্পষ্ট হবে।
Leave a Reply