যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ন্যাটোর ভবিষ্যৎ কী হতে পারে? (২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫)

ভূমিকা

নর্থ অ্যাটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন (NATO) বর্তমানে সামরিক জোটের ৭৫ বছরের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দোরগোড়ায় যুদ্ধ চলমান থাকা সত্ত্বেও, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন এক অনিশ্চয়তা কাজ করছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেক আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্রদের অভিযুক্ত করে আসছেন যে, তারা প্রতিরক্ষা খাতে নিজেদের ন্যায্য হিস্যা অনুযায়ী ব্যয় করছে না এবং যুক্তরাষ্ট্রকে কার্যত ফ্রি রাইডার হিসাবে ব্যবহার করছে। ট্রাম্পের প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ (Pete Hegseth) সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ইউরোপে চিরস্থায়ী ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে: ট্রাম্প যদি ন্যাটোর কাঠামোকে নাড়িয়ে দেন, তাহলে কি জোটটি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া টিকে থাকতে পারবে?

ট্রাম্পের সম্ভাব্য পদক্ষেপ ও ন্যাটোর স্থিতিশীলতার প্রশ্ন

ট্রাম্প কিভাবে ন্যাটোকে আমূল বদলে দিতে পারেন, তা নিয়ে কয়েকটি দৃশ্যপট আছে। সবচেয়ে নাটকীয় ও অস্থিরতা সৃষ্টিকারী পদক্ষেপ হবে যদি ট্রাম্প সত্যিকার অর্থেই যুক্তরাষ্ট্রকে সম্পূর্ণরূপে ন্যাটো থেকে সরিয়ে নেন। অতীতে তিনি এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন (John Bolton) মনে করেন যে ট্রাম্প তার পরবর্তী মেয়াদে এমন একটি পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।

কিছু বিশ্লেষক অবশ্য মনে করেন, এটি হতে পারে কেবলমাত্র একটি রাজনৈতিক ব্লাফ। পাশাপাশি উল্লেখ্য যে, ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস এমন একটি আইন পাস করেছে যা কোনো প্রেসিডেন্টকে একতরফাভাবে ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যেতে দেয়না। কিন্তু এই আইন শতভাগ ‘আয়রনক্ল্যাড’ বা নিশ্চিত নয়, এবং ট্রাম্প তা উপেক্ষা করার চেষ্টা করতে পারেন। যদিও ন্যাটো থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে আসা একটি চরম পদক্ষেপ, ট্রাম্প হয়তো কম নাটকীয় কিন্তু কার্যকর আরেকটি উপায় অবলম্বন করতে পারেন, যাকে অনেকে ‘সফট উইথড্রয়াল’ (Soft Withdrawal) বলে অভিহিত করেন। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র নামমাত্র ন্যাটো সদস্য হিসেবে থাকলেও, জোটের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রমে আসল সহায়তা দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। এর ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা অনেকাংশে নিজেরাই পরিচালনা করতে হবে।

‘সফট উইথড্রয়াল’ কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে

সফট উইথড্রয়ালের একটি উদাহরণ হতে পারে, যদি ট্রাম্প সরাসরি ঘোষণা করেন যে, ন্যাটো সনদের আর্টিকেল ৫ যুক্তরাষ্ট্র আর মানতে বাধ্য থাকবে না। উল্লেখ্য এই আর্টিকেল ৫-ই হলো সেই আর্তিকেল যেটি ন্যাটোর কোনো সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে সেটাকে ন্যাটোভুক্ত সকল দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করে এবং সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করে। ট্রাম্প ইতোমধ্যে আর্টিকেল ৫ সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, যারা জিডিপির ২% লক্ষ্যমাত্রা প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করতে পারবে না, তাদের ওপর কোনো হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র সাহায্যে এগিয়ে আসবে না। এমনকি তিনি রাশিয়াকেও “চাইলে যা করার তা করতে” উসকানি দিতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। ইউক্রেনে হাইপোথেটিকালভাবে কোনো শান্তিরক্ষী বাহিনী (Peacekeeping Contingent) পাঠানো হলে, তাদেরও আর্টিকেল ৫ এর আওতায় রক্ষা করা হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।

এই ধরনের অবস্থান ন্যাটোর ঐক্যকে দুর্বল করবে। কারণ যদি কোনো বাল্টিক রাষ্ট্রের ওপর রাশিয়া হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার বা সীমিত সামরিক আগ্রাসন চালায়, এবং যুক্তরাষ্ট্র তখন প্রতিক্রিয়া দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে অন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো আর্টিকেল ৫ প্রয়োগ নিয়ে একধরনের দ্বিধাগ্রস্ততার মধ্যে পড়বে। একবার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিভেদ দেখা দিলে, ন্যাটোর প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ডেটারেন্সই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

সফট উইথড্রয়ালের আরেকটি দিক হলো ইউরোপ থেকে মার্কিন সেনা উল্লেখযোগ্যহারে প্রত্যাহার করা। ইউরোপীয় কর্মকর্তারা শঙ্কা প্রকাশ করছেন যে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এমন ঘটনা ঘটলে, বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপের বাল্টিক অঞ্চল সবচেয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এই এলাকায় অবস্থানকারী মার্কিন সেনারা রাশিয়ার আক্রমণ বা আগ্রাসন রুখতে একটি প্রধান প্রতিরোধ বলয় হিসেবে কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ, জো বাইডেন রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর ইউরোপে যে অতিরিক্ত ২০,০০০ মার্কিন সেনা পাঠিয়েছিলেন, ট্রাম্প যদি তাদের ফিরিয়ে নেন, তাহলে মহাদেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এক ধাক্কায় প্রায় ২০% কমে যাবে। ফলে ইউরোপ বুঝে যাবে যে, তাদের নিরাপত্তার ভার অনেকখানিই নিজেদের বহন করতে হবে।

ইউরোপের নিরাপত্তার ভার: যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কমে যাওয়ার ফলাফল

ট্রাম্পের নির্দিষ্ট পদক্ষেপ যাই হোক, বাস্তবতা হলো যুক্তরাষ্ট্র আর ইউরোপের প্রধান নিরাপত্তা রক্ষক হিসেবে থাকতে চায় না। কাজেই ইউরোপকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রছাড়া ন্যাটো আসলে কতটা কার্যকর হতে পারে?

ইতিবাচক দিক হলো, যুক্তরাষ্ট্র বাদ দিলেও ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্যদের সম্মিলিত সক্রিয় সামরিক সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখের বেশি। রাশিয়া গত বছর তাদের সামরিক সদস্যসংখ্যাকে ১৫ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে, কিন্তু ইউরোপের সামরিক সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে আধুনিক। পাশাপাশি, ইউক্রেনের সেনারা কম সম্পদ নিয়েও যেভাবে রাশিয়ার অগ্রযাত্রাকে প্রতিহত করেছে, তার চেয়েও অনেক বেশি উন্নত প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম ইউরোপের আছে।

এ ছাড়া ইউরোপের প্রতিরক্ষা-শিল্প (Defence Industry) যথেষ্ট শক্তিশালী ও সুপ্রতিষ্ঠিত। বিশ্বের শীর্ষ ১০টি অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে অর্ধেকই ইউরোপীয় ন্যাটো সদস্য। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ ও রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রেক্ষিতে ইউরোপীয় দেশগুলো সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছে। ৩২টি ন্যাটো সদস্য দেশের মধ্যে এখন ২৩টি দেশ প্রতিরক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত ২% ব্যয় করছে, যেখানে এক দশক আগেও ২% ব্যয় করত মাত্র ৩টি দেশ। অর্থাৎ ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

প্রতিরক্ষা ব্যয় ও বাস্তব কাঠামো: সাফল্য ও দুর্বলতা

ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ার পেছনে দুটি বড় প্রভাবক কাজ করছে—ট্রাম্পের আগের চাপ ও রাশিয়ার ইউক্রেনে আক্রমণ। তবে ব্যয় বৃদ্ধি সত্ত্বেও কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

প্রথমত, প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়ে তা বাস্তব সামরিক সক্ষমতায় রূপান্তর করতে সময় লাগে। নতুন সরঞ্জাম কেনা, সেনা সংখ্যা বাড়ানো, প্রশিক্ষণ ইত্যাদিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, ইউরোপের প্রতিরক্ষা শিল্পখাত বিভিন্ন দেশে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে। প্রতিটি দেশ নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পকে উৎসাহিত করতে চায়, ফলে একীকরণ (Defragmentation) করা কঠিন। এতে ব্যয় বেড়ে যায়, প্রযুক্তি উন্নয়নে সময় বেশি লাগে এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচও চড়া হয়।

তৃতীয়ত, অনেক ইউরোপীয় দেশে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ-সংকট আছে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্যের সামরিক বাহিনী ২০১৫ সালের পর থেকে নতুন কমব্যাট ব্যাটালিয়নের (Combat Battalion) সংখ্যা বাড়াতে পারেনি, বরং কিছু ব্যাটালিয়ন কমিয়েছে। অথচ ব্রুগেল (Brueghel) ও কিয়েল ইনস্টিটিউটের (Kiel Institute) হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া ইউরোপকে নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অন্তত ৩ লাখ নতুন সেনা দরকার হবে।

এ সব মিলিয়ে বোঝা যায়, সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি এক জিনিস, কিন্তু তা থেকে কার্যকর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা তৈরি করা আরেক বড় চ্যালেঞ্জ।

নিউক্লিয়ার আমব্রেলার অভাব ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্ট্র্যাটেজিক এনাবলার’ ভূমিকা

যুক্তরাষ্ট্রের বিদায় বা সক্রিয় ভূমিকা হ্রাসের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে পারমাণবিক অস্ত্র বা নিউক্লিয়ার আমব্রেলা নিয়ে। ন্যাটোর “সুপ্রিম গ্যারান্টি” বা সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক প্রতিরক্ষা। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য পরমাণু অস্ত্রধারী দেশ হলেও, রাশিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় তাদের ওয়ারহেড সংখ্যা খুবই কম। উপরন্তু, এই দুই দেশের কাছে ট্যাকটিক্যাল নিউক্লিয়ার উইপন নেই, যা রাশিয়ার কাছে আছে। যদি ট্রাম্প ইউরোপ থেকে মার্কিন পারমাণবিক ছাতা সরিয়ে নেন, তবে ন্যাটোর এই উচ্চতর নিরাপত্তা বলয়টি দুর্বল হয়ে পড়বে।

নিউক্লিয়ার আমব্রেলার বাইরেও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্র হলো ন্যাটোর প্রধান ‘স্ট্র্যাটেজিক এনাবলার’। এর মধ্যে রয়েছে বড় পরিসরের এয়ারলিফট ক্যাপাবিলিটি, এয়ার-টু-এয়ার রিফুয়েলিং, হাই অল্টিচুড এয়ার ডিফেন্স, মহাকাশ পর্যবেক্ষণ ও সম্পদ (Space Assets) এবং অপারেশনাল ইন্টেলিজেন্স। অনেক বিশ্লেষকের মতে, কোনো বড় শক্তির বিরুদ্ধে দির্ঘমেয়াদি সংঘাত হলে এই সক্ষমতাগুলো অপরিহার্য। সংক্ষিপ্ত পাল্টাপাল্টি হামলা পেরিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে প্রবেশ করলে, ন্যাটোর যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর এই কাঠামোই বড় সহায়ক হয়ে ওঠে। যদি ট্রাম্প এসব ক্ষেত্রে হাত গুটিয়ে নেন বা সহায়তা কমিয়ে দেন, ইউরোপকে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তুলতে অন্তত এক দশকের ধারাবাহিক বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা দরকার হবে।

ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের একজন বিশেষজ্ঞ ক্যামিল গ্রঁ (Camille Grand) উল্লেখ করেছেন যে, “ইউরোপীয় দেশগুলোকে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় যেতে হবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য কমলেও নিজেদের প্রতিরক্ষা নিরাপত্তা বজায় রাখা যায়।

ব্যয় বৃদ্ধির সম্ভাব্য রূপরেখা

ইউরোপ যদি যুক্তরাষ্ট্রহীন নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে চায়, তাহলে ব্রুগেল ও অন্যান্য গবেষণা সংস্থার ভাষ্য মতে, ন্যাটোর সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৩.৫% পর্যন্ত উঠতে পারে। এটি বর্তমানের ২% লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। অর্থায়নের উপায়গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হতে পারে সম্মিলিত ইউরোপীয় ঋণ (Joint EU Borrowing), যেমন কোভিড-১৯ মহামারির সময় ইইউ যে বিশাল তহবিল সংগ্রহ করেছিল। প্রতিরক্ষা শিল্পকে একীভূত (Defragmenting) করে ব্যয় সাশ্রয় করা যেতে পারে। পাশাপাশি, ইইউ চাইলে নিজেদের স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি চুক্তি (Stability and Growth Pact) কিছুটা শিথিল করে প্রতিরক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু এ সব পদক্ষেপের বিরুদ্ধেও জনমত থাকতে পারে। কারণ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানো মানে প্রায়ই অন্য সামাজিক বা অর্থনৈতিক খাত থেকে অর্থ কাটা পড়া, কিংবা কর বাড়ানো বা সরকারি ঋণ বৃদ্ধি — যা ভোটারদের কাছে অজনপ্রিয় হতে পারে।

গত কয়েক দশক ধরেই ন্যাটো ইউরোপের নিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ছিল সবচেয়ে বড় সামরিক ও অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষক। যুক্তরাষ্ট্র যদি সরে যায় বা বড় পরিসরে আগ্রহ হারায়, ন্যাটোর ঐতিহ্যবাহী ভিত্তি কতটা অটুট থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক। ইউরোপীয় দেশগুলো ইতোমধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াচ্ছে, কিন্তু সেই ব্যয় যে দ্রুত কার্যকর সামরিক শক্তিতে পরিণত হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ফলে, ন্যাটো একটি নতুন সন্ধিক্ষণে উপস্থিত হয়েছে।

ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন ও কৌশল

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কমলে ইউরোপে রাশিয়া আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ পাবে। রাশিয়া ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলে (Eastern Flank) ঐতিহাসিকভাবেই প্রভাব বিস্তারে আগ্রহী। তারা যদি দেখে যে, যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো জোরালোভাবে ন্যাটোকে সহায়তা করছে না, তাহলে হয়তো ছোটখাটো সীমিত আগ্রাসন বা হাইব্রিড ওয়ারফেয়ারের মাধ্যমে ইউরোপকে চাপে ফেলতে চেষ্টা করবে। অন্যদিকে, চীন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে চাইবে। চীন ইতোমধ্যে বিশ্বের একটি প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি এবং সামরিক সক্ষমতাও দ্রুত বাড়াচ্ছে। ইউরোপ যখন মার্কিন নির্ভরতায় ফাটল দেখবে, তখন চীনের সঙ্গে গভীর বিনিয়োগ চুক্তি বা প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ব্যাপারে আগ্রহী হতে পারে। তবে সেটিরও সামরিক ও নিরাপত্তাগত দিক আছে, যা ইউরোপকে বেশ ভাবিয়ে তুলতে পারে।

এখন প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর অর্থ হলো, সরকারের বাজেটে অন্য খাতে কাটছাঁট বা ঋণ বাড়ানো। ইউরোপে অনেক মানুষ মনে করে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই — এসব ক্ষেত্রেই বেশি বরাদ্দ প্রয়োজন। ফলে প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত ব্যয় সহজ সিদ্ধান্ত নয়। শক্তিশালী সমাজকল্যাণ কাঠামোর দেশে (যেমন নর্ডিক দেশগুলো) নাগরিকরা উচ্চ পরিমাণ কর দিতে রাজি থাকলেও, সেটা প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার ব্যাপারে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে। একইভাবে দক্ষিণ ইউরোপের বেশ কিছু দেশে অর্থনীতি এখনও দুর্বল, উচ্চ বেকারত্ব ও ঋণ সমস্যা রয়ে গেছে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যয় মেলানো আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

ন্যাটোর যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থা (Collective Decision-Making) ও কমান্ড কাঠামো (Command Structure) বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর ছিল। বড় কোনো সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে মার্কিন সেনাবাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি উপস্থিতি ও সংস্থান (Resources) ছিল প্রায় অনিবার্য। যদি এখন যুক্তরাষ্ট্র সেই ভূমিকা কমিয়ে দেয়, ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের একটি যৌথ পরিকল্পনা ও কমান্ড ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। এর জন্য অবশ্যই বড় আকারের বাজেট, প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক ঐক্যমত্য দরকার। এ ধরনের ঐক্যমত্য গড়ে তোলাও সহজ নয়, কারণ প্রতিটি দেশের নিজস্ব স্বার্থ ও সামরিক নীতি (Military Doctrine) রয়েছে।

এখন যদি যুক্তরাষ্ট্রের নিউক্লিয়ার আমব্রেলার আওতা কমে যায়, তখন ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মধ্যেই পারমাণবিক সক্ষমতা রক্ষার দায়িত্ব থেকে যায়। কিন্তু তাদের কাছে রাশিয়ার মতো বিপুল ট্যাকটিক্যাল ও স্ট্র্যাটেজিক (Strategic) ওয়ারহেড নেই। ফলে, ইউরোপীয় পরমাণু প্রতিরক্ষার ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। অনেকে প্রস্তাব দিচ্ছেন, ইউরোপকে একটি সমন্বিত পারমাণবিক নীতি (Integrated Nuclear Policy) গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য পারমাণবিক প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে আরও কাছাকাছি সমন্বয় রাখবে। তবে এ ব্যাপারে ইউরোপের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ও জনমত একেবারে সহায়ক হবে, এমনটাও বলা যায় না।

এদিকে রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ন্যাটোর সম্প্রসারণকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে অভিহিত করে এসেছে। যদি তারা দেখতে পায় যে, যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোতে আর তেমন সক্রিয় নয়, তখন রাশিয়া হয়তো পূর্ব ইউরোপের কোনো অঞ্চলে ছোটখাটো অভিযান চালাবে, কিংবা সাইবার আক্রমণ (Cyber Attack) বা প্রপাগান্ডার (Propaganda) মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করবে।  বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো (লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, এস্তোনিয়া) রাশিয়ার পাশেই অবস্থিত। সেখানে যদি যুক্তরাষ্ট্রের সেনা উপস্থিতি কমে যায়, রাশিয়া মনে করবে যে, এই অঞ্চলগুলোতে তাদের প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি কম। আবার, ন্যাটো যদি আর্টিকেল ৫ প্রয়োগ করতে গড়িমসি করে, তাহলে জোটের ভেতরেই বিভক্তি তৈরি হবে। এই পরিস্থিতি মূলত রাশিয়ারই সুবিধা বাড়ায়।

আবার চীন গত কয়েক বছরে ইউরোপে বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তি খাতে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রবেশ করেছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের এর অংশ হিসেবে চীন দক্ষিণ ও পূর্ব ইউরোপে বন্দর, রেলপথ ইত্যাদিতে বিনিয়োগ করছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউরোপে তার সামরিক ভূমিকা কমায়, তখন চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব আরো গভীর হতে পারে। তবে এর অর্থ ইউরোপকে ভূরাজনৈতিক এক ভারসাম্যের মধ্যে পড়তে হবে। চীনের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া গেলেও, নিরাপত্তা ও মানবাধিকার ইস্যুতে চীনের সঙ্গে ইউরোপের মতবিরোধ রয়েছে। তাছাড়া, ইউরোপের প্রযুক্তি ও সামরিক গুরুত্বপূর্ণ খাত চীনা বিনিয়োগ বা প্রভাবের মধ্যে পড়লে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ বাড়তে পারে।

এখন ন্যাটোর সামগ্রিক সামরিক পরিকল্পনা ও অভিযান (Operations) অনেকাংশে মার্কিন প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য বা ইন্টেলিজেন্সের ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র উঁচুমানের স্যাটেলাইট সারভেইলেন্স, সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রসেসিং সক্ষমতা সরবরাহ করে। যদি এই সহযোগিতা কমে যায়, ইউরোপকে বিকল্প উৎস তৈরির জন্য বা নিজেদের স্যাটেলাইট সক্ষমতা ও সাইবার প্রতিরক্ষা গড়ে তুলতে প্রচুর বিনিয়োগ করতে হবে। কিন্তু এই কাজ রাতারাতি সম্ভব নয়। এতে সময়, অর্থ এবং প্রযুক্তিগত পারদর্শী ব্যক্তিবলের দরকার পড়বে। ইউরোপের অনেক দেশে ইতোমধ্যে প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও জনবল ঘাটতি আছে।

উল্লেখ্য যে, রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে ফিনল্যান্ড ও সুইডেন ন্যাটোতে যোগদানের আগ্রহ দেখিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রবিহীন ন্যাটো হলে তাদের সদস্যপদ কতটা কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারবে, এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। যদি ন্যাটো আর্টিকেল ৫ কার্যকরভাবে প্রয়োগ না করে, তা হলে নতুন সদস্যরাষ্ট্র পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হবে। অন্যদিকে, কিছু দেশ যারা আগে ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, তারা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ হ্রাসের ফলে আরও বেশি দ্বিধায় পড়বে। ফলে ন্যাটোর সম্প্রসারণ প্রক্রিয়াও অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হতে পারে।

আমরা জানি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নকে (Soviet Union) প্রতিহত করতে ন্যাটো গঠিত হয়েছিল। সেই থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এর মূল চালিকাশক্তি। শীতল যুদ্ধের (Cold War) সময় থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বেশ কিছু সামরিক অভিযানে (যেমন আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া), যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ও সামরিক শক্তি ছিল অনুঘটকের মতো। এই দীর্ঘ ইতিহাসে ন্যাটো নিজেদের ভেতর দৃঢ় ঐক্য বজায় রেখেছিল মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণে। এখন যদি সেই কেন্দ্রবিন্দুই দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে ৭৫ বছরের পুরোনো এই জোটের ভবিষ্যৎ কীভাবে গড়ে উঠবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

এদিকে যুক্তরাজ্য ন্যাটোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তাদের নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র, শক্তিশালী গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক (Intelligence Network) এবং ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘বিশেষ সম্পর্ক’ (Special Relationship) রয়েছে। ট্রাম্পের আমলে যদি যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোতে অনাগ্রহী হয়ে ওঠে, তখন যুক্তরাজ্য একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে বন্ধুত্ব বজায় রাখা ও অন্যদিকে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা — এই দু’দিক সামলাতে গিয়ে চাপে পড়তে পারে। ব্রেক্সিট (Brexit)-পরবর্তী সময়ে ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন থাকায় সামরিক ক্ষেত্রে ঐক্য বজায় রাখা আরও কঠিন হতে পারে।

এখন, ইউরোপে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই অর্থনৈতিক শক্তি হলো জার্মানি ও ফ্রান্স। ন্যাটো-পরবর্তী বা যুক্তরাষ্ট্রবিহীন ন্যাটো পরিস্থিতিতে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতোমধ্যেই জার্মানি প্রতিরক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। ফ্রান্স তার সামরিক নীতি বিশেষ করে পারমাণবিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে জোর দিচ্ছে। তবে দুই দেশেই অভ্যন্তরীণ জনমত ও বাজেট নিয়ে বিতর্ক আছে। জার্মানিতে ঐতিহাসিক শান্তিবাদী মনোভাব এখনও শক্তিশালী, আর ফ্রান্সে কর ও সরকারি ব্যয় ইস্যুতে নাগরিকদের মধ্যে ভিন্নমত বিদ্যমান। সেই সঙ্গে জার্মানি-ফ্রান্স সম্পর্ক সবসময় সম্পূর্ণ সুগম নয়; নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব বা স্বার্থের সংঘাত সেখানে বিদ্যমান। কাজেই, ইউরোপীয় প্রতিরক্ষার নতুন কাঠামো গড়ে তুলতে হলে এ সব বাধা পেরোতে হবে।

এছাড়া, ন্যাটোর মধ্যে রয়েছে তুরস্ক, গ্রিস ও আরও কিছু দেশ, যাদের পারস্পরিক সম্পর্কে টানাপোড়েন আছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই এইসব দ্বন্দ্বে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রাখত, বা অন্তত ভারসাম্য রক্ষা করত। যদি এখন যুক্তরাষ্ট্র দূরে সরে যায়, তুরস্ক-গ্রিসের বিরোধ বা অন্যান্য আঞ্চলিক বিবাদ জোরালো হতে পারে। অন্যদিকে, কানাডা ন্যাটোর আরেক সদস্য। তারাও ইউরোপের নিরাপত্তায় কতটা অবদান রাখবে, কিংবা রাখার সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা আছে কি না, এ নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠবে।

সার্বিক মূল্যায়ন

ইউরোপে সামরিক কাঠামো কীভাবে পুনর্গঠিত হবে, তা নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। কেউ কেউ ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) অভ্যন্তরে একটি ‘ইউরোপীয় সেনাবাহিনী’ (European Army) গড়ার প্রস্তাব দিয়ে আসছেন। আবার কারো মত, ইউরোপীয় দেশগুলো স্বতন্ত্রভাবে শক্তি বাড়িয়ে ন্যাটোর ছাতার তলায় থাকলেও হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বা কম থাকা অবস্থায়, ঐক্যবদ্ধ একটি সামরিক নীতি ও কাঠামো কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। প্রতিটি দেশের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা দৃষ্টিভঙ্গি আছে, যা সহজে একত্রিত করা যায় না। এছাড়া নেতৃস্থানীয় দেশগুলোর মধ্যে নেতৃত্ব ও প্রভাব নিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতাও দেখা দিতে পারে।

সামরিক ব্যয় বৃদ্ধিতে ইউরোপের প্রতিরক্ষা শিল্প, গবেষণা (R&D) এবং উচ্চপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের বিকাশ হতে পারে। অনেক সামরিক প্রযুক্তি পরবর্তীতে বেসামরিক খাতে ব্যবহৃত হয়, যা অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে। এই যুক্তি দেখিয়ে কিছু রাজনীতিক প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর পক্ষে সাফাই গেয়ে থাকেন। তবে বাস্তবে এই বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট হয় কর বাড়িয়ে বা অন্য খাত থেকে অর্থ নিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিকভাবে এটি কঠিন, কারণ নাগরিকদের মধ্যে সবসময় প্রতিরক্ষা নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতে বেশি বিনিয়োগের চাহিদা থাকে। তদুপরি, সামরিক খাতে বাজেট বাড়িয়ে পরবর্তী লাভ পেতে অনেক সময় লাগতে পারে, যা ভোটারদের কাছে স্বল্পমেয়াদে জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নয়।

এখন, ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে সামরিকীকরণের প্রতি বরাবরই সন্দেহ ও অনীহা আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দুঃসহ অভিজ্ঞতা অনেককে শান্তিবাদী করে তুলেছিল। প্রতিরক্ষা খাতে বড় অঙ্কের ব্যয় বৃদ্ধি করলে সামাজিক শ্রেণি বা রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিভাজন দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইউরোপের হাতে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প হয়তো সীমিত। যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতায় বড় ফাটল ধরলে, ইউরোপীয় দেশগুলোকে বাধ্য হয়েই নিজস্ব সামরিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। এতে ঐতিহাসিক শান্তির ধারণার সঙ্গে বাস্তবতার সংঘাত ঘটতে পারে।

নিরাপত্তা জোট হিসেবে ন্যাটোর বড় শক্তি হলো এর সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ পদ্ধতি (Collective Decision-Making)। প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, যা জোটের ঐক্য বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সদস্য রাষ্ট্রের সংখ্যা বেড়ে এখন ৩০-এর বেশি (সাম্প্রতিক সময়ে আরও সদস্য যোগ দেওয়ায় সংখ্যা ৩২ পর্যন্ত পৌঁছেছে), এবং সবার মধ্যে ঐকমত্যে পৌঁছানো সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত নেতৃত্ব দিয়ে এই ঐকমত্যে পৌঁছাতে সহায়তা করত। তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব এত বেশি যে, ছোট দেশগুলো শেষ পর্যন্ত আপোস করে নিত। কিন্তু যদি যুক্তরাষ্ট্র নিষ্ক্রিয় হয়, তখন বড় ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোই (যেমন ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেন, পোল্যান্ড) জোট পরিচালনায় একচ্ছত্র বা বেশি প্রভাব বিস্তার করবে। এতে অন্য ছোট রাষ্ট্রগুলো তাদের স্বার্থ রক্ষিত হবে কি না, সে প্রশ্ন তুলতে পারে। ফলে ন্যাটোর অভ্যন্তরে নতুন ধরণের রাজনৈতিক টানাপোড়েন সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

ট্রাম্প “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতি নিয়ে চলে আসছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থই সর্বাগ্রে। মিত্র দেশগুলোর প্রতিরক্ষা অর্থায়ন না বাড়ালে তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা সীমিত করার হুমকি দিয়েছেন তিনি। তার এই মনোভাব ইউরোপকে বাস্তবিকই বাধ্য করেছে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে। যদি তিনি আবার ক্ষমতায় আসেন এবং ন্যাটো থেকে সরে যাওয়ার উদ্যোগ নেন, এটি শুধু তার মেয়াদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রশাসনগুলোর কাছেও বিষয়টি একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করবে যে, ইউরোপে বিশাল সামরিক উপস্থিতি রাখা আনিবার্য নয়। সুতরাং, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত সাময়িক বলে মনে হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায়।

সবকিছু মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রহীন বা যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা হ্রাসপ্রাপ্ত ন্যাটো এখন আর একেবারেই অকল্পনীয় নয়। ইউরোপের দেশগুলো সামরিক ব্যয় বাড়াচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মার্কিন নিউক্লিয়ার আমব্রেলা ও উন্নত সামরিক সহায়তা ছাড়া ন্যাটোর প্রতিরক্ষা স্তম্ভ কতটা দৃঢ় থাকবে, সেটি অনিশ্চিত। আরও স্পষ্ট করে বললে, ইউরোপকে সামনে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। প্রথমত, বাড়তি বাজেট এবং সেনা সংখ্যা জোগাড় করা। দ্বিতীয়ত, পরমাণু সক্ষমতার প্রশ্নে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো। তৃতীয়ত, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা। চতুর্থত, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধিকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা। এগুলো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নানা রকমের বাধা আসবে — জনমতের বিরোধিতা, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, ইউরোপীয় দেশগুলোর পারস্পরিক স্বার্থের সংঘাত ইত্যাদি। তবুও, ন্যাটোকে ধরে রাখতে হলে ইউরোপের হাতে বিকল্প খুব একটা বেশি নেই। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অনুপস্থিতি বা অনাগ্রহ ইউরোপকে সম্পূর্ণ নতুন প্রতিরক্ষা নকশায় এগিয়ে যেতে বাধ্য করবে।

তথ্যসূত্র

  1. https://www.the-independent.com/news/uk/politics/donald-trump-us-quit-nato-defence-ben-wallace-b2711422.html
  2. https://www.goldmansachs.com/insights/articles/how-much-will-rising-defense-spending-boost-europes-economy
  3. https://www.iiss.org/online-analysis/military-balance/2025/02/global-defence-spending-soars-to-new-high/
  4. https://www.piie.com/blogs/realtime-economics/2025/trumps-five-percent-doctrine-and-nato-defense-spending
  5. https://abc3340.com/news/nation-world/president-elect-donald-trump-reopens-possibility-of-us-leaving-nato-if-allies-dont-pay-their-bills-military-spending-gdp-ukraine-war-russia-europe-canada-mark-rutte
  6. https://eda.europa.eu/news-and-events/news/2024/12/04/eu-defence-spending-hits-new-records-in-2023-2024
  7. https://www.lawfaremedia.org/article/trump-can-t-withdraw-from-nato–but-he-could–quiet-quit
  8. https://www.nato.int/nato_static_fl2014/assets/pdf/2024/6/pdf/240617-def-exp-2024-en.pdf
  9. https://www.bu.edu/articles/2024/pov-the-truth-behind-trumps-nato-threats/
  10. https://apnews.com/article/trump-nato-presidential-election-congress-republicans-20e902788e8701999ce0424f73d478cc
  11. https://www.cnn.com/2019/01/15/politics/trump-nato-us-withdraw/index.html
  12. https://www.atlanticcouncil.org/blogs/natosource/trump-confirms-he-threatened-to-withdraw-from-nato/
  13. https://www.atlanticcouncil.org/blogs/econographics/whos-at-2-percent-look-how-nato-allies-have-increased-their-defense-spending-since-russias-invasion-of-ukraine/
  14. https://www.nato.int/nato_static_fl2014/assets/pdf/2023/7/pdf/230707-def-exp-2023-en.pdf

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.




This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.