Table of Contents
ভূমিকা
“তুমি লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনের সঙ্গে জুয়া খেলছো। তুমি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে জুয়া খেলছো।” এই অভিযোগ ছিল হোয়াইট হাউসে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ট্রাম্পের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উক্তি, যা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে তীব্র মতবিরোধের প্রকাশ ঘটায়। আলোচনায় ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর জেডি ভ্যান্স ও কিছু গণমাধ্যমকর্মীও।
এই বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় মূলত কয়েকটি কারণে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ইউক্রেনের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান, কেননা রাশিয়া ইতোমধ্যে ইউক্রেনের ভূখণ্ডে আগ্রাসন চালাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ‘রেয়ার আর্থ মিনারেলস’ সংক্রান্ত একটি সম্ভাব্য চুক্তি দুটি দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে পারত। কিন্তু বৈঠকের পর স্পষ্ট হয়ে যায়—চুক্তি ভেঙে পড়েছে, সামরিক সহায়তা ভীষণ অনিশ্চয়তায় পড়েছে, আর প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে বলতে গেলে অসম্মানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
এ লেখায় সেই বৈঠকের পটভূমি, কী কী আলোচনা হল, কীভাবে সবকিছু ভয়াবহ মোড় নিল এবং এর পর ইউরোপ ও রাশিয়ার দিক থেকে কী প্রতিক্রিয়া এল—সেসব পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হবে।
চুক্তির পটভূমি: কেন এই ‘রেয়ার আর্থ মিনারেলস’ নিয়ে বিরোধ
ইউক্রেনের মাটির নিচে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ‘রেয়ার আর্থ মিনারেলস’ আছে, যা আধুনিক প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, গাড়ি, স্মার্টফোনসহ নানা খাতে ব্যবহার করা হয়। এই খনিজ সম্পদ বৈশ্বিক বাজারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জেলেনস্কির সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে প্রস্তাব দিয়েছিল—যদি তাদের দেশের নিরাপত্তায় জোরালো সহায়তা এবং সামরিক সাহায্য নিশ্চিত করা হয়, তাহলে এই খনিজ সম্পদের বড় একটি অংশে মার্কিন বিনিয়োগ বা মালিকানা দেওয়া হবে। অনেকে মনে করেন, এটি ইউক্রেনের জন্য দ্বিগুণ লাভজনক হতে পারত—একদিকে সামরিক সুরক্ষা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে মার্কিন সম্পৃক্ততা।
ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পরিমাণ খনিজ সম্পদ দাবি করে বিতর্ক উসকে দিয়েছিল। পরে যদিও আলোচনা এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে একটি যৌথ তহবিল গঠন করে বার্ষিক আয়ের ৫০% পুনর্গঠন ও নিরাপত্তার কাজে ব্যয় করার কথা ভাবা হয়। ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি চুক্তিভিত্তিক অংশীদার হলে রাশিয়াও আগ্রাসী নীতি থেকে সরে আসতে পারে। কেননা তখন ইউক্রেনকে আক্রমণ করা মানেই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে আঘাত। কিন্তু বাস্তবে কী ঘটল? হোয়াইট হাউসের বৈঠকে গিয়েই দেখা গেল, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিয়ে জটিলতা এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে চুক্তিটি কার্যত ভেস্তে গেল।
বৈঠক শুরুর পরিবেশ: যেভাবে সবকিছু ঘোলাটে হয়ে ওঠে
শুক্রবার সকাল থেকেই প্রত্যাশা ছিল—হোয়াইট হাউসে ঐতিহাসিক কোনো সমঝোতার ঘোষণা আসতে পারে। ট্রাম্প নিজে এই বৈঠককে এক ধরনের “শান্তি আলোচনার (ceasefire agreement)” সূচনা বলে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে মার্কিন মধ্যস্থতায় একটা যুদ্ধবিরতি কিংবা শান্তি প্রক্রিয়া শুরু হোক। কিন্তু বৈঠক শুরু হতেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা সংক্রান্ত প্রসঙ্গে দুই নেতার মতবিরোধ স্পষ্ট হয়।
জেলেনস্কি প্রথমেই বলেন—“আমরা (ইউক্রেন) এক বিশাল সম্পদ ছেড়ে দিতে রাজি হয়েছি, তাই আমরা প্রত্যাশা করি আমাদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার বিষয়ে পরিষ্কার আশ্বাস পাব।” আর ট্রাম্পের অবস্থান ছিল—“আমরা যথেষ্ট সাহায্য করেছি। এখন তোমাদের (ইউক্রেন) উচিত শান্তির পথে অগ্রসর হওয়া।” এটি শুরুর পর্যায়েই দ্বন্দ্বমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করে।
জেডি ভ্যান্সের ভূমিকা: উত্তেজনা কেন বাড়ল
বৈঠকের সময় জেডি ভ্যান্স সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি সরাসরি জেলেনস্কিকে উদ্দেশ করে বেশ কিছু প্রশ্ন তোলেন। উদাহরণস্বরূপ, ভ্যান্স বলেন, “আপনার দেশে জনবল সংকট আছে, সৈন্য সংগ্রহ করতে কনস্ক্রিপশন (conscription) ব্যবহার করতে হচ্ছে। এখন আমরা (আমেরিকা) যদি আপনাদের সাহায্য না করি, তাহলে এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হতে পারত।” জেলেনস্কি জবাবে বলেন যে, রাশিয়া হচ্ছে আগ্রাসী পক্ষ; তাদের অব্যাহত হামলার মুখে ইউক্রেনের সামনে বিকল্প খুবই সীমিত।
এক পর্যায়ে ভ্যান্স সরাসরি বলেন, “আপনি (জেলেনস্কি) হোয়াইট হাউসে এসে আমাদের প্রেসিডেন্টকে অপমান করছেন, অথচ আমাদের দেশ আপনাদের এত সহায়তা দিয়েছে।” জেলেনস্কি জানিয়ে দেন, তিনি কোনো অপমান করেননি; বরং যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের প্রতি সবসময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তাতেও উত্তেজনা কমেনি, বরং আরও বেড়ে যায়।
মুখোমুখি অভিযুক্তির ঝড়: ট্রাম্প ও ভ্যান্সের কঠোর অবস্থান
বৈঠকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দৃশ্য ছিল যখন ট্রাম্প জেলেনস্কিকে বলেন, “তুমি লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনের সঙ্গে জুয়া খেলছো। তুমি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে জুয়া খেলছো।” জেডি ভ্যান্সও সুর মেলান, বলেন—“আপনি কী একবারও আমাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন? আমেরিকা আপনার চেয়ে বেশি আর কী করতে পারত?”
অভিযোগ ওঠে যে, জেলেনস্কি পেনসিলভানিয়ার পিলো শহরে গিয়ে ট্রাম্পের বিরোধী দলের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন। জেলেনস্কি এটিকে পুরোপুরি মিথ্যা বলে অভিহিত করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বৈঠকের শুরুতেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আর ইউক্রেনকে সহায়তার বিষয়ে ইউরোপের ভূমিকা কম নয়। তা সত্ত্বেও ওভাল অফিসের বৈঠকে খুবই একপেশে আক্রমণের শিকার হতে হয় তাকে।
পোশাক নিয়ে বিদ্রূপ: ‘স্যুট পরেন না কেন?’
বৈঠকের মাঝপথে কেউ একজন প্রশ্ন তোলেন—“আপনি (জেলেনস্কি) স্যুট কেন পরছেন না? আপনার কি কোনো স্যুট আছে?” ঘটনাটি অনেকের কাছেই অপ্রাসঙ্গিক ও অপমানজনক বলে মনে হয়। যুদ্ধকালীন সময়ে একজন প্রেসিডেন্ট সামরিক বা স্বচ্ছন্দ পোশাক পরে থাকতেই পারেন। জেলেনস্কির উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত—“এই যুদ্ধ শেষ হলে আমি স্যুট পরব।”
অনেকে এই ঘটনা দেখে মন্তব্য করেন, এর ফলে বোঝা যায় বৈঠকের লক্ষ্য যদি শান্তি বা চুক্তি নিয়ে আলোচনা হতো, তাহলে ব্যক্তিগত পোশাকের প্রসঙ্গ তোলা অত্যন্ত অপ্রয়োজনীয় এবং এ থেকে জেলেনস্কিকে হেয় করা হয়েছে বলেই মনে হয়।
বৈঠকের ফলাফল: চুক্তি ভেস্তে যাওয়া ও সামরিক সহায়তার অনিশ্চয়তা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই বৈঠক অবশেষে কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। জেলেনস্কি সময়ের আগেই বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন। স্বভাবতই ‘রেয়ার আর্থ মিনারেলস ডিল’ যা দুই দেশের জন্যই উপকারী হতে পারত, তা এখন প্রায় বাতিলের পথে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নিয়ে দেখা দিয়েছে বিশাল অনিশ্চয়তা।
ট্রাম্প পরে তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লেখেন—“জেলেনস্কি যখন শান্তির জন্য প্রস্তুত হবে, তখন যেন ফিরে আসে।” এটা স্পষ্টতই বোঝায় যে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন ইউক্রেনকে রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বাধ্য করতে চাইছে, এমনকি সেটা ইউক্রেনের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার দাবি উপেক্ষা করে হলেও।
ইউরোপের প্রতিক্রিয়া: সমর্থন ও সমালোচনা
জেলেনস্কির বিপাকে পড়ার পর ইউরোপের বেশিরভাগ নেতা ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। ডোনাল্ড টাস্ক, ইমানুয়েল ম্যাকরোঁ, মের্ত্জ এবং উরসুলা ভন ডেয়ার লেয়েন সবাই মিলে জেলেনস্কির পাশে থাকার ঘোষণা দেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি কায়া কালাস (Kaya Kallas) একটি জোরালো মন্তব্য করেন—“মুক্ত বিশ্বের নতুন নেতার প্রয়োজন।” অনেকে এটিকে ট্রাম্পের উদ্দেশে করা কটাক্ষ হিসেবেই দেখছেন, যেখানে তিনি ইঙ্গিত করছেন যে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর সেই ঐতিহাসিক ভূমিকায় নেই।
তবে সবাই একমত নন। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান ট্রাম্পের প্রশংসা করে বলেন, “শক্তিশালী নেতা শান্তি আনেন, আর দুর্বলরা যুদ্ধ বাধায়।” এতে বোঝা যায়, ইউরোপের মধ্যেই মতপার্থক্য আছে। কেউ কেউ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ইউক্রেনকে দ্রুত কোনো এক সমঝোতায় নিয়ে যেতে পারে, অন্যদিকে বেশিরভাগ ইউরোপীয় নেতা রাশিয়াকে দোষী বলে মনে করে এবং ইউক্রেনের পাশে থাকতে চান।
রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া: অশালীন মন্তব্য ও উল্লাস
রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই বৈঠকের ফলাফলকে স্বাগত জানানো হয়, কেননা এতে স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের সম্পর্ক অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। রাশিয়ার সিকিউরিটি কাউন্সিলের উপপ্রধান জেলেনস্কিকে “অপমানজনক শুকর” (insolent pig) বলে উল্লেখ করেন। রাশিয়ার সংসদের উচ্চকক্ষের উপপ্রধান কটাক্ষ করে বলেন—“ওভাল অফিসে যে ধকল গিয়েছে, তাতে জেলেনস্কিকে পরেরবার হাঁটু গেড়ে বৈঠকে যেতে হবে।”
এ ধরনের মন্তব্যের মাধ্যমে রাশিয়া যে বৈঠকে জেলেনস্কির অসম্মানজনক অবস্থান দেখে আনন্দ পাচ্ছে, তা বেশ স্পষ্ট।
জেলেনস্কির পদক্ষেপ: ক্ষতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা
বৈঠকের ঠিক পর জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ (X) এ যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে ধন্যবাদ জানান। এরপর ফক্স নিউজে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে তার মতভেদ সম্পর্কে ব্যাখ্যা করেন। জেলেনস্কি বলেন, “ট্রাম্প বলেছেন, তিনি আলোচনার টেবিলের কেন্দ্রে থাকতে চান, যাতে রাশিয়া ও ইউক্রেনকে একসঙ্গে আনতে পারেন। আমি চাই তিনি সত্যিকারভাবে আমাদের পাশে থাকুন, কারণ রাশিয়া আমাদের ভূখণ্ডে যুদ্ধ নিয়ে এসেছে, আমাদের পরিবার ও ঘরবাড়িতে আঘাত হেনেছে।”
এভাবেই জেলেনস্কি মূলত বোঝাতে চান যে, রাশিয়া আগ্রাসন বন্ধ না করলে শান্তি আলোচনা শুধু ইউক্রেনের একতরফা ছাড় দেওয়ার মতো হবে।
ড্রোন হামলায় প্রাণহানি: রাশিয়ান হামলা অব্যাহত
ওয়াশিংটনে এই বৈঠক ও বিতর্ক চলার সময়ই ইউক্রেনে আরেকটি ড্রোন হামলায় কমপক্ষে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এটি মনে করিয়ে দেয় যে, যুদ্ধ আসলেই এখনো চলছে এবং রাশিয়া প্রতিনিয়ত ইউক্রেনের এলাকায় আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতা থেকে স্পষ্ট, কূটনৈতিক মীমাংসা বা আলোচনার সুযোগ থাকলেও রাশিয়া সশস্ত্র হামলা থামায়নি। তাই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো আলোচনাই যে ইউক্রেনের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, সেটি জেলেনস্কির বক্তব্যে বারবার উঠে আসে।
সামগ্রিক বিশ্লেষণ: রাজনীতি, অর্থনীতি ও নেতৃত্বের প্রশ্ন
এখন বেশিরভাগ পর্যবেক্ষক বলছেন, হোয়াইট হাউসের এই বৈঠক সম্ভবত এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হবে। ইউক্রেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে সম্ভাব্য বড় একটি অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা হতে পারত, তা এখন মারাত্মক হুমকির মুখে।
ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি যে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও “ডিল করার প্রবণতা” দ্বারা চালিত, এখানে তা আবার স্পষ্ট হলো। এদিকে রাশিয়া সরাসরি কোনো ছাড় দেয়নি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গভঙ্গি দেখে আরও উল্লসিত মনে হচ্ছে। অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন—ট্রাম্প সত্যিকারের শান্তিচুক্তি করতে না পেরে বরং রাশিয়াকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে স্বার্থক হতে দিচ্ছেন।
ইউরোপীয় নেতৃত্বও এ পরিস্থিতিতে স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা ইউক্রেনের পাশে থাকবে। কিন্তু শুধু কথায় কত দূর যাবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। ইউক্রেন যদি মার্কিন সহায়তা হারায়, ইউরোপের পক্ষে এককভাবে সব দায়িত্ব নেওয়া কঠিন হবে। তাছাড়া ইউরোপের মধ্যেও ভিক্টর অরবানের মতো নেতৃত্ব আছেন, যাদের দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি আলাদা।
উপসংহার
এই ঘটনার মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির অবস্থান আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে গেল। একদিকে রাশিয়ার আগ্রাসন অব্যাহত, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা এখন হুমকির সম্মুখীন। তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন খনিজ সম্পদ চুক্তি কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। ওভাল অফিসের বৈঠকে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও পোশাক নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে অধিকাংশ মানুষই ভাবছেন একেবারে অপ্রয়োজনীয় ও অপমানজনক।
ট্রাম্প শেষমেশ বলেই দিয়েছেন—“তুমি (জেলেনস্কি) যখন শান্তির জন্য প্রস্তুত হবে, তখন ফিরে এসো।” কিন্তু কী ধরনের শান্তি? রাশিয়া কি সংলাপে বসবে কোন গ্রহণযোগ্য শর্তে? রাশিয়া কি তাদের আগ্রাসন বন্ধ করবে? জেলেনস্কি জোর দিয়েছেন যে, তারা (ইউক্রেন) যুদ্ধ শুরু করেনি; যুদ্ধটা রাশিয়া জোরপূর্বক ইউক্রেনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে। তাই যদি কোনো আলোচনায় বসতেই হয়, তবে সেখানে ইউক্রেনকে এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে, যাতে তারা নিজেদের ভূখণ্ড ও নাগরিকদের নিরাপত্তা বজায় রাখতে পারে।
অন্যদিকে ইউরোপের নেতারা বলছেন, তারা ইউক্রেনের পাশে থাকবেন, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত সহায়তা ছাড়া রাশিয়াকে থামানো কঠিন হবে। তাই ‘মুক্ত বিশ্বের নেতা’ হিসেবে যাকে ধরা হয়, সেই অবস্থান এখন প্রশ্নবিদ্ধ। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও ভবিষ্যতে নতুনভাবে বিন্যস্ত হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, এই বৈঠক এক গুরুত্বপূর্ণ সংকেত দিয়েছে—বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য (balance of power) কোথায় যাচ্ছে? যুক্তরাষ্ট্র কি নিজের ঐতিহাসিক দায়িত্ব থেকে সরে আসছে? ইউক্রেন কীভাবে টিকে থাকবে বা রাশিয়া কোথায় থামবে—এসব প্রশ্নের জবাব এখনো অস্পষ্ট। তবে এটা প্রায় নিশ্চিত, জেলেনস্কি বনাম ট্রাম্পের এই উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা পরবর্তী বিশ্বপরিস্থিতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
(তথ্যসূত্র কমেন্টে)
তথ্যসূত্র
https://unric.org/en/rare-earths-and-strategic-minerals-in-ukraine/
https://www.reuters.com/markets/commodities/what-are-ukraines-rare-earths-why-does-trump-want-them-2025-02-05/
https://edition.cnn.com/2025/02/27/europe/ukraine-titanium-mine-rare-earth-trump-deal-intl-hnk/index.html
Leave a Reply