
ইন্টারনেট আজকাল সন্ত্রাসবাদী জঙ্গীদের সমরাস্ত্রে পরিণত হয়েছে, এরা সোশাল মিডিয়া এবং আনুসঙ্গিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে, সদস্য সংগ্রহ, সমন্বয়, সংগঠন, প্রচার সবই চালাচ্ছে। এই প্রযুক্তিকেই উল্টে ওদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে, শুধু ওদেরকে ধরাই নয়, একই সাথে সাম্ভাব্য জঙ্গী হামলা সংঘটিত হবার আগেই আঁচ করে বানচাল করে দিতে পারা কি সম্ভব?
প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটা কাজ আমরা করতেই পারি, অনলাইনে থাকা জঙ্গী এবং সমর্থকদের ভাষার আদানপ্রদান এবং নিয়মিত কার্যক্রম পর্যবেক্ষন করতে পারি। একটা হামলার আগে পরে দিয়ে যদি আমরা ওদের তৎপরতা বা ভাষার ভিন্নতাগুলো শনাক্ত করতে পারি, এটা সম্ভব হতেই পারে, যে আমরা ভবিষ্যিতে এই প্যাটার্ন এর সাথে মিলিয়ে সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা চলাকালে বুঝে ফেলতে পারবো। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির রিসার্চাররা তাঁদের নতুন একটা পরীক্ষণ এ ঠিক এই কাজটাই করার চেষ্টা করেছেন। তারা কম্পিউটার সিমুলেশন এর মাধ্যমে দেখিয়েছেন, কিভাবে সোশাল নেটওয়ার্ক সাইটগুলোর মাধ্যমে কিভাবে ইসলামিক স্টেট এর আনঅফিশিয়াল সমর্থকগোষ্ঠি তৈরী হয় বিস্তার লাভ করে এবং কিভাবে এর সাথে জঙ্গী হামলার সম্ভাব্য সময় সম্পর্কযুক্ত।
এর পরপরই গবেষনা করা হয়, কিভাবে টুইটার মেসেজ বিশ্লেষন করে বোঝা যায় একজন ব্যক্তি আইএস কে সমর্থন করছে কি করছে না। এছাড়া অন্য গবেষনায় গবেষকেরা ডেটা মাইনিং ব্যবহার করে সোশাল নেটওয়ার্কের বিপুল ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষন করে এটা শনাক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন যে ঠিক কোন সময় একজন মৌন সমর্থক প্রো-আইএস আচরণ শুরু করছে।
এছাড়া অন্যরা টেক্সট এনালাইসিস সফটওয়ার দিয়ে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, সহিংস হামলা ঘটানোর আগের মাসগুলোতে উদ্দিষ্ট চরমপন্থী গোষ্টীর কথাবার্তার ধরণে বেশ পার্থক্য চোখে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ বলি, যদি ছোট সরল বাক্যাংশে, সহজ শব্দে, ছোট বাক্যে ভেঙে প্রকাশ করা হয়, তাহলে ভাষা বোঝার জটিলতা হ্রাস পায়, ভাষাগত ধরণটা বোঝা যায়।
ল্যাঙ্কেস্টার ইউনিভার্সিটিতে পল যে টেইলর এবং পল রেইসন এর সাথে আমাদের নিজেদের রিসার্চ এ আমরা লিঙ্গুইস্টিক সফটওয়ার ব্যাবহার করে বিভিন্ন চরমপন্থি ইসলামি গোষ্ঠীর ব্যবহৃত কথাবার্তা এবং ভাষার প্যাটার্ন খুঁজে বের করে, ওদের মেসেজ থেকে বিভিন্ন সূত্র খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি। আমরা Collocation নামক একটি প্রদ্ধতি ব্যবহার করেছি, যার কাজ হচ্ছে শব্দ, ধারণা ও অনুসঙ্গের মধ্যে পারষ্পরিক সম্পর্কের শক্তি যাচাই করা, এক কথায় স্বাভাবিক ব্যবহারের চাইতে বেশি বা আকষ্মিকভাবে কোন শব্দ বেশি ব্যবহার হচ্ছে কিনা যাচাই করা। আমরা দেখিয়েছি, চরমপন্থীদের মেসেজ দেখেই আপনি তাৎক্ষনিক বুঝতে পারবেন, এখানে কোন ব্যক্তি বা স্থানকে ইতিবাচক নাকি নেতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কিছু ব্যক্তির নামের সাথে Agentry (শত্রুপক্ষের এজেন্ট) বিশেষন যোগ করে বলা হচ্ছে আবার অন্য কিছু ব্যক্তিকে “Heroic” ধাঁচের কথায় বিভুষিত করা হচ্ছে।
এই পদ্ধতির মাধ্যমে যেসমস্ত ব্যক্তি, স্থান বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি জঙ্গীরা সহিংস মনোভাব পোষন করেন সেগুলো হাইলাইট করে, তাদের সম্ভাব্য হামলার স্থান বের করা সম্ভব। উদাহরণ দিয়ে দেখাই, কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি, স্থান বা প্রতিষ্ঠান নিয়ে কথা বলার সময়, “target” “targeting” “attack” বা “kill” প্রায় সব সময় দৃঢ়ভাবে ব্যবহার করা হয়। কোথায় এবং কি প্রসঙ্গে এগুলো টেক্সট এ ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটা খেয়াল করলেই হয়তো একটা ধারণা পাওয়া সম্ভব যে কোন ব্যক্তি, স্থান বা প্রতিষ্ঠান হামলার ঝুঁকিতে আছে।
অন্যান্য প্রযুক্তি:
যাই হোক, এসমস্ত পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, অনলাইন নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেসমস্ত অঘটনগুলো ঘটছে, সেগুলোর ব্যাপারে কিছু করার নেই। প্রতিটা স্টাডিই গোটা সন্ত্রাস বাস্তুসংস্থানের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়াদি নিয়ে। তাই যতক্ষন পর্যন্ত না এটা প্রমাণ করা সম্ভব হবে যে এই প্যাটার্নগুলো প্রায় সব ধরণের সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমের সাথে সংশ্লিষ্ট, ততক্ষন পর্যন্ত এসবের গুরুত্ব নিয়ে বাগাড়ম্বরের ব্যাপারে সচেতন থাকা উচিৎ এবং মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগ থেকেও সহিংসতা ঘটিতে পারে।
অনলাইনে জঙ্গীদের যোগাযোগ গোটা ছবির একটা অংশমাত্র। তাছাড়া, সম্ভাব্য জঙ্গীদের উদ্বেগ, চাপ বা গোপনীয়তার ধরণ পর্যবেক্ষন করে, অফলাইনের সংযোগমূলক আচরণ স্টাডি করারও পথ আছে। উদাহরণস্বরূপ, আমরা সেন্সর বা ইনফ্রারেড স্ক্যানার বা ব্রেইন ইমেজিং টেকনলিজির মত প্রযুক্তি ব্যবহার করে,শরীরের মধ্যকার বা শরীর, মুখ, চোখের গতিবিধির পরিবর্তন পর্যবেক্ষন করতে পারি। অনেকেই বলে থাকেন, যদি এধরণের প্রযুক্তি বিমানবন্দরের মত জায়গায় ব্যবহার করা হয়, তাহলে সম্ভাব্য হামলাকারীর উদ্দেশ্য সম্পর্কে সতর্ক হওয়া সম্ভব।
২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হানিওয়েল ল্যাবরেটরিজ এ রিসার্চাররা দেখিয়েছিলেন, Thermal Imaging প্রযুক্তির মাধ্যমে সনাক্ত করা সম্ভব একধরণের উত্তাপ, যা সাধারণত কাউকে ধোঁকা দেয়ার সময় চোখে প্রকাশ পায়। তারা সুপারিশ করেছিলো , এই পদ্ধতিতে আকাশযাত্রীদের উড্ডয়নপূর্বক সাক্ষাতকার দক্ষ জনবল ছাড়াই খুব দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
মানবিক বিষয়াদি:
এধরণের কোন পদ্ধতিই কিন্তু নিখুঁত নয়। এয়ারপোর্টে একজন ব্যক্তি অনেক কারণেই উদ্বিগ্ন হতে পারেন, তার মানে এই নয়, তিনি কর্তৃপক্ষকে ধোঁকা দিতে চাইছেন বা কিছু ঘটাতে চলেছেন। হয়তো বিমানে ওড়া নিয়েই তিনি ঘাবড়ে আছেন। এই প্রযুক্তিগুলো শতভাগ নির্ভুল নয়। এগুলো ল্যাবের পরিবেশে সাজানো ঘটনা বিশ্লেষনের জন্যে প্রস্তুতকৃত, বাস্তব পরিস্থিতিতে কতটা কার্যকরী হবে বলা।যায় না।
অনেকেই বলে থাকেন, প্রযুক্তির কাছে তিনটে অতি জরুরী মনুষ্য গুণাবলী নেই: অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধ এবং বিবেচনাবোধ। যার অর্থ দাঁড়ায়, প্রযুক্তি এমন কিছুকে অপ্রয়োজনীয় ভাবতে পারে, যা শুধুই মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব। তাই, যদিও প্রযুক্তির মাধ্যমে জঙ্গীদের সংযোগ পর্যবেক্ষন করে তাদের হামলা সম্পর্কে ধারণা নেয়া সম্ভব, কিছুতেই একে মানবিক বিবেচনাবোধের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায় না এবং ব্যবহারটাও হওয়া উচিৎ সতর্কতার সাথে।
–
Sheryl Prentice, Post-Doctoral Researcher in Linguistics, Lancaster University
https://theconversation.com/how-technology-could-help-predict-terrorist-attacks-61113
অনুলিখন: অনুসন্ধানী আবাহন
Leave a Reply