গেলাপেগোস দ্বিপপুঞ্জে ভ্রমণের পর চার্লস ডারউইন প্রস্তাব করেছিলেন, যখন প্রজাতিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ খাদ্যসম্পদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বা কম্পিতিশন শুরু হয় তখন সেই প্রজাতিগুলো এই কম্পিটিশন কমানোর জন্য সেই প্রজাতিগুলো একে অপরের থেকে ডাইভার্জ করতে চায়। অর্থাৎ এদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য থেকে একাধিক বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়। যেমন যেসব ফিঞ্চ পাখির প্রজাতি বীজ খায় তাদের ঠোঁট শক্ত হয়। আবার যেসব ফিঞ্চ ক্যাকটার ফুল থেকে নেকটার নেয় তাদের ঠোঁট সরু। ডারউইনের এই নীতিকে একসময় প্রিন্সিপল অব ক্যারেক্টার ডাইভারজেন্স বলা হত। এখন ইকোলজিকাল ক্যারেক্টার ডিসপ্লেসমেন্ট বলা হয়। যাই হোক, ডারউইনের প্রায় দুইশ বছর পর গবেষকগণ শেষপর্যন্ত একটি জিন আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে যা ঠোঁটের বিভিন্ন আকার ব্যাখ্যা করে। গবেষণাটি সাইন্স জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
সকল ডারউইন ফিঞ্চেরই সাধারণ পূর্বপুরুষ প্রায় দুই মিলিয়ন বছর পূর্বে গেলাপেগোসে এসেছিল। এখন তাদের ১৮টি প্রজাতি আছে যারা বিভিন্ন রেঞ্জের দৈহিক আকার, ঠোঁটের আকার, কণ্ঠস্বর এবং খাদ্যগ্রহণ কৌশল প্রদর্শন করে। গতবছর আপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেইফ এন্ডারসন এর নেতৃত্বে একদল গবেষক একটি জার্নালে প্রকাশ করেছিল ALX1 নামে একটি জিন পাখির ঠোঁটের বিভিন্ন ধরণের আকারের সাথে সম্পর্কিত। এই দলটিই এখন ফিঞ্চদের ঠোঁটের দ্রুত বিবর্তনের উপর নজর দিয়েছে।
ফিঞ্চের ছয়টি বিভিন্ন প্রজাতির (স্মল, মিডিয়াম ও লার্জ গ্রাউন্ড ফিঞ্চ এবং স্মল, মিডিয়াম ও লার্জ ট্রি ফিঞ্চ) ৬০টি পাখির জিনোম সিকুয়েন্স করে দলটি HMGA2 নামে একটি জিন খুঁজে পেয়েছে যেটা মিডিয়াম গ্রাউন্ড ফিঞ্চ (Geospiza fortis) এর শরীর এবং ঠোঁটের আকারের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এরপর গবেষকগণ ৭১টি মিডিয়াম গ্রাউন্ড ফিঞ্চ এর জিনোম এনালাইস করেন যারা ২০০৪ থেকে ২০০৫ সালে গেলাপেগোসের তীব্র খরায় হয় টিকে গিয়েছিল না হয় মরে গিয়েছিল। HMGA2 এর দুটো ভেরিয়েন্ট আছে। এদের মধ্যে একটি ছোট ঠোঁটের ফিঞ্চদের মধ্যে পাওয়া যায়। আরেকটি পাওয়া যায় বড় ঠোঁটের ফিঞ্চদের মধ্যে। দেখা যায় এই ছোট ঠোঁটের ফিঞ্চদের কাছে থাকা HMGA2 এর ভেরিয়েন্টটির দুটো সেটই (একটি বাবার থেকে পাওয়া আরেকটি মা এর থেকে) যেসকল মিডিয়াম গ্রাউন্ড ফিঞ্চের শরীরে থাকে তারা বড় ঠোঁটের ফিঞ্চদের বেলায় পাওয়া HMGA2 এর ভেরিয়েন্ট যুক্ত পাখিদের চেয়ে বেশি টিকে থাকতে পেরেছে। ছোট ঠোঁটের ভেরিয়েশনটির ফ্রিকোয়েন্সি টিকে যাওয়াদের ধরীরে ছিল ৬১ শতাংশ যেখানে যারা মারা গেছে তাদের শরীরে এদের ফ্রিকোয়েন্সি ছিল ৩৭ শতাংশ।
যখন এনভায়রনমেন্টাল কন্ডিশনগুলোর পরিবর্তন ঘটেছিল তখন এই জিনটি পাখিগুলোর ঠোঁটের দ্রুত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অবদান রেখেছিল। গেলাপেগোসে খরার কারণে খাদ্যাভাব দেখা গিয়েছিল। আর এই খাদ্যাভাবের বিরুদ্ধে জিনটির প্রত্যুত্তর দিতে এক বছরেরও কম সময় লেগেছে। এই জিনটি পাখিটির মধ্যে স্থায়ী শারীরিক পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলে যার ফলে মিডিয়াম গ্রাউন্ড ফিঞ্চ তাদের প্রতিযোগী লার্জ গ্রাউন্ড ফিঞ্চদের (Geospiza magnirostris) থেকে ডাইভার্জ করতে বাধ্য হয়। এটা ইকোলজিকাল ক্যারেক্টার ডিসপ্লেসমেন্টের ক্ষেত্রে একটি পরিষ্কার উদাহরণ।
গবেষণাটির কো-অথর প্রিন্সটনের পিটার গ্রান্ট তার একটি স্টেটমেন্টে বলেছেন, “এটা একটি শক্তিশালী নেচারাল সিলেকশনের ঘটনা ছিল। আমরা দেখিয়েছি যে HMGA2 লোকাসটি খরার সময়ে এই পাখিটির ইভোল্যুশনারি শিফট এবং নেচারাল সিলেকশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং এখন পর্যন্ত প্রকৃতিতে রেকর্ড করা সর্বোচ্চ ইভোল্যুশনারি শিফটগুলোর মধ্যে এটা অন্যতম”।
পূর্বে HMGA2 জিনটিকে কুকুর ও ঘোড়ার আকারের ভিন্নতা এবং মানুষের শরীরের গঠনের সাথে সম্পর্কিত করা গিয়েছিল। ক্যান্সারের সাথেও এই জিনটির সম্পর্ক আছে। এন্ডারসন তার একটি স্টেটমেন্টে বলেন, “এটা সত্যিই একটি আকর্ষণীয় ব্যাপার যে এই জিনটিকে বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যেই কার্যকরী হয়ে উঠতে দেখা যায় যেখানে এই জিনটি তাদের বৃদ্ধিতে প্রভাবিত করে। মানুষের ক্ষেত্রে এই জিনটি ক্যান্সারের অনিয়ন্ত্রিত কোষের বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে”। যাই হোক, ঠিক কিভাবে এই জিনটি মানবদেহ গঠন এবং ডারউইনের ফিঞ্চদের ঠোঁটের আকারে প্রভাবিত করে তা এখনও রহস্য। আশা করা যায় একদিন এই রহস্যটিও আমাদের সামনে উন্মোচিত হবে।
http://science.sciencemag.org/cgi/doi/10.1126/science.aad8786
http://www.imbim.uu.se/Research/+Genomics/Andersson_Leif/?languageId=1
http://www.eurekalert.org/pub_releases/2016-04/pu-gb042116.php
http://www.eurekalert.org/pub_releases/2016-04/uu-eia041516.php
-বুনোস্টেগস
Leave a Reply